নিজস্ব প্রতিবেদক: নদী-নালা ও বিল-হাওড়ে ভরা বাংলাদেশে প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহের নানা উপাদান। তেমনই এক প্রাকৃতিক উৎসকে কাজে লাগিয়ে নিজের চরম অভাবের সংসারকে সচ্ছলতার আলোয় আলোকিত করেছেন গাইবান্ধার এক সাধারণ মাছ বিক্রেতা। বিলের ক্ষতিকারক কাঁকড়া ধরে ও বিক্রি করে আজ তিনি প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা অনায়াসে আয় করছেন, যা তার সংসারের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনা ও গবাদি পশুর খামার পরিচালনার খরচ জোগাচ্ছে।
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ৪ নম্বর সাঘাটা ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা নিবারণ সরকার চরের বিল থেকে কাঁকড়া সংগ্রহের মাধ্যমে এই অবিশ্বাস্য সাফল্য পেয়েছেন।
যেভাবে শুরু হলো কাঁকড়া বিক্রির গল্প
নিবারণ সরকার মূলত আগে থেকেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে মাছ বিক্রি করতেন। মাছ বিক্রির আয় দিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে তিনি প্রায়ই চরম আর্থিক অনটন ও 'ঠ্যাকার' মধ্যে থাকতেন। মাছ বিক্রি করতে গিয়ে বিভিন্ন গ্রামের মানুষ তার কাছে বিলের কাঁকড়ার খোঁজ করতেন এবং কাঁকড়া এনে দেওয়ার অনুরোধ জানাতেন।
গ্রাহকদের এই চাহিদাকে মাথায় রেখে তিনি নিজ এলাকার বিষ্ণুপুরের বিল থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করা শুরু করেন। কাঁকড়া সংগ্রহ করার প্রক্রিয়ায় বেশ মেহনত রয়েছে। ভোরবেলা বিলে গিয়ে বিশেষ জাল পেতে রাখা হয় এবং সকাল ৬টা থেকে ৭টার দিকে সেই জাল তোলা হয়। জালের ভেতর মাছের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া ধরা পড়ে। এরপর সেই কাঁকড়াগুলোকে বিল থেকে সংগ্রহ করে এনে ভালো করে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার ও তাজা অবস্থায় বিক্রির জন্য ঝুড়িতে (ডালিতে) সাজানো হয়।
বিলের ক্ষতিকারক পোকা থেকে আয়ের উৎস
বিলে কাঁকড়ার উপস্থিতি একদিকে চাষীদের জন্য বেশ ক্ষতিকারক। নিবারণ সরকার জানান, এই কাঁকড়াগুলো বিলের চাষ করা ধান কেটে নষ্ট করে ফেলে এবং মাটির আইল বা বাঁধ ফুটো করে দেয়, যার ফলে জমিতে পানি ধরে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে। কৃষকদের জন্য আপদ এই কাঁকড়াকেই তিনি নিজের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন।
বর্তমানে তিনি প্রতিদিন গড়ে ২০, ২৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত কাঁকড়া সংগ্রহ করেন। প্রথম প্রথম বিলে কাঁকড়ার পরিমাণ বেশি থাকায় দিনে ৪০ কেজি বা ১ মণ পর্যন্ত কাঁকড়াও ধরা পড়ত, তবে দীর্ঘদিন ধরার ফলে এখন পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে।
গাইবান্ধা ও পার্শ্ববর্তী জেলায় কাঁকড়ার বিশাল বাজার
কাঁকড়া প্রতিদিন একই মানুষ বা একই এলাকায় নিয়মিত খায় না, তাই নিবারণ সরকারকে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় যেতে হয়। তিনি গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি, গোবিন্দগঞ্জ এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা রংপুরের পীরগঞ্জ ও শটিবাড়ীসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাঁকড়া বিক্রি করেন। বিশেষ করে স্থানীয় বিভিন্ন বাজারের হোটেল বা দোকানদারেরা তার বড় ক্রেতা।
কাঁকড়ার কোনো নির্দিষ্ট বাজার দর বা রেট করা থাকে না। এলাকা ও ক্রেতা ভেদে তিনি প্রতি কেজি কাঁকড়া ৩০, ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ টাকা দরে বিক্রি করেন। কোনো কোনো দিন গ্রাহকেরা পিস হিসেবে (২০, ২৫ বা ৩০ টা) কাঁকড়া কিনে থাকেন, আবার অনেকে একসাথে ২ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত কাঁকড়া কেনেন। নিবারণ সরকার বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তার কাছ থেকে কাঁকড়া কেনেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে কাঁকড়া এবং কুচিয়া খেলে আমাশয়সহ বিভিন্ন শারীরিক ও পেটের রোগ থেকে উপকার পাওয়া যায়।
সাময়িক এই ব্যবসায় সচ্ছলতা
কাঁকড়া বিক্রির এই ব্যবসাটি মূলত একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার আষাড় মাস থেকে বিলের পানি থাকা পর্যন্ত অর্থাৎ আষাড়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাস পর্যন্ত—বছরের এই ৭-৮ মাস বিলে প্রচুর কাঁকড়া পাওয়া যায়।
শীতের শেষে বিলের পানি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে কাঁকড়া ধরার কোনো সুযোগ থাকে না। তখন নিবারণ সরকার পুনরায় নিয়মিত মাছ কেনাবেচা এবং রাস্তায় ভ্যান/গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কাঁকড়া ও মাছের এই ব্যবসার সমন্বয়ে বর্তমানে তার মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা নিশ্চিত আয় হচ্ছে, যা দিয়ে তার পুরো পরিবার অত্যন্ত সুন্দর ও ভালোভাবে দিনাতিপাত করছে।