বউয়ের শখের জিনিস বিক্রি করে ব্যবসা শুরু! জাদু দেখালেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জামাই

নিজস্ব প্রতিবেদক: চাকরি পাওয়ার আশায় কয়েক লাখ টাকা প্রতারণার শিকার হয়ে যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, তখন ঘুরে দাঁড়ানোর অন্য এক গল্প তৈরি করলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক। স্ত্রীর শখের একটি দামি জিনিস বিক্রি ও বিভিন্ন ধার-দেনা থেকে পাওয়া ৩ লাখ টাকারও বেশি পুঁজি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি জেলা গাইবান্ধায় শুরু করেন ব্যবসা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর ‘কালাই রুটি’র স্বাদ গাইবান্ধার ভোজনরসিকদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে এখন তিনি একজন সফল রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। শ্বশুরবাড়ির এলাকায় 'চাঁপাইনবাবগঞ্জের জামাই'-এর এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে

চাকরি নিয়ে প্রতারণা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানো

এই তরুণ উদ্যোক্তার মূল বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় হলেও তার শ্বশুরবাড়ি গাইবান্ধায়। মূলত তিনি এবং তার স্ত্রী দুজনেই চাকরির উদ্দেশ্যে প্রথম গাইবান্ধায় এসেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কন্টাক্ট করতে গিয়ে তারা বড় অঙ্কের আর্থিক প্রতারণার শিকার হন। এরপর তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে না গিয়ে গাইবান্ধাতেই থেকে যান এবং একটি বেসরকারি কোম্পানিতে প্রায় আড়াই বছর চাকরি করেন। তবে সেখানেও বেতন নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে

একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে রাতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে এক অভিনব পরিকল্পনা করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কালাই রুটি গাইবান্ধার মানুষকে খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তারা। পুঁজির সংকট থাকায় স্ত্রী তার নিজের অত্যন্ত শখের একটি দামি জিনিস সেক্রিফাইস (বিক্রি) করেন এবং বাকি টাকা বিভিন্ন ধার-দেনার মাধ্যমে জোগাড় করে প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে পুরো সেটআপ তৈরি করেন তিনি

প্রথম দিনেই বাজিমাত ও দৈনন্দিন বিক্রি

উদ্যোক্তা জানান, ব্যবসার প্রথম দিনেই তারা ৫০ কেজি আটার আয়োজন নিয়ে মাঠ নামেন, যার মধ্যে প্রথম দিনেই প্রায় ২০ কেজি আটার রুটি এবং মাংস বিক্রি হয়। প্রথম দিনের বিক্রি থেকেই আয় আসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা

বর্তমানে আবহাওয়া এবং কাস্টমারের আগমন ভেদে প্রতিদিন গড়ে ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা বা তারও বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। সাধারণত সন্ধ্যার পর একটু ঠান্ডা আমেজ থাকলে দূর-দূরান্ত থেকে কাস্টমাররা বেশি আসেন এবং বিক্রিও বাড়ে, তবে বৃষ্টি হলে বিক্রি কিছুটা কমে যায়

খাঁটি উপাদানের সমাহার ও রুটির দাম

কালাই রুটির আসল স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখতে তারা প্রধান কাঁচামাল—যেমন মাষকলাইয়ের আটা ও চালের আটা সরাসরি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে কিংবা যাতায়াতের সময় নিজস্ব লোক দিয়ে আনিয়ে নেন। এমনকি রুটি তৈরির কারিগরদেরও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেই নিয়ে আসা হয়েছে

এখানে প্রতি পিস কালাই রুটির দাম মাত্র ৩০ টাকা। এই ৩০ টাকার রুটির সাথে স্পেশাল সরিষা ভর্তা, মরিচ ভর্তা এবং চাটনি সম্পূর্ণ ফ্রি দেওয়া হয়। এছাড়া মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় পোড়া বেগুন ভর্তা। রুটির সাথে খাওয়ার জন্য মাংসের আইটেমে রয়েছে হাঁসের মাংস, গরুর মাংস, নেহারি, বট এবং মুরগির মাংস। মাঝে মাঝে কাস্টমারদের জন্য রুটি ও মাংসের কম্বো অফারও দেওয়া হয়। এছাড়া দুপুরে এখানে ভাত আইটেম এবং স্পেশাল হাঁস-খিচুড়ির ব্যবস্থাও থাকে। দূর এলাকার গ্রাহকদের জন্য পার্সেল ও হোম ডেলিভারির সুবিধাও রয়েছে

ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান: ভিন্ন রান্নার ব্যবস্থা

রেস্তোরাঁটিতে হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষই কালাই রুটি খেতে আসেন। গ্রাহকদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে রেস্তোরাঁর মালিক রান্নার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। তিনি জানান, গরুর মাংস এবং হাঁসের মাংস সম্পূর্ণ আলাদা কড়াইয়ে এবং আলাদা আলাদা চামচ ব্যবহার করে রান্না ও পরিবেশন করা হয়, যাতে কারো কোনো ধরনের আপত্তি না থাকে

অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এই সুস্বাদু রুটি ও মাংসের আয়োজন চলে। কাস্টমার দোকানে আসার পর সম্পূর্ণ লাইভ বা গরম গরম রুটি বানিয়ে দেওয়া হয়, ফলে রুটি নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না

গাইবান্ধা শহরের রেলগেট থেকে পলাশবাড়ী রোডে, নির্বাচন অফিসের পাশে, শাপলামিল সংলগ্ন (আমেন সেঞ্চুরির মোড়) এলাকায় 'চাপাইবাড়ি রেস্তোরাঁ' (Chapaibari Restaurant) নামে এই আউটলেটটি অবস্থিত। উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো, এই ঐতিহ্যবাহী ও পুষ্টিকর কালাই রুটির স্বাদ পুরো গাইবান্ধা জেলার মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যবসার আরও বিস্তার ঘটানো