আজরাইল দেখা যায়, কিন্তু ডাক্তার নয়! চরের প্রসূতি মা’দের জীবনভরসা ‘মমতার তরি’

ডাক্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক: নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে মধ্যরাতে হঠাৎ কোনো অন্তঃসত্ত্বা মায়ের প্রসব বেদনা উঠলে যেন নেমে আসে নিকষ অন্ধকার। চারদিকে থৈ থৈ পানি, ঘাটে নৌকা নেই, নেই কোনো মাঝি, পকেটে নেই পর্যাপ্ত টাকাও। তখন চোখের সামনে যমদূত বা আজরাইলের ছায়া দেখা গেলেও কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলা ভার। চরের অসহায় মানুষের এই চরম বাস্তবতাকে পাল্টে দিয়েছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া একটি বিশেষ বোট অ্যাম্বুলেন্স, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মমতার তরি’

গাইবান্ধার নদী ও চরাঞ্চল কাপাসিয়া ও জানানির বিস্তীর্ণ দুর্গম এলাকায় প্রসূতি মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচাতে এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উদ্যোগ

আজরাইলের ভয় তাড়িয়ে রঙিন স্বপ্নের সারথি

চরাঞ্চলের অসহায় পরিবারগুলোর রাতের সেই আতঙ্ক আর বুকফাটা আর্তনাদের গল্প বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি বলেন: "অনেক রাত ১২টা যখন একটা মায়ের ব্যথা ওঠে, কোন কুল-কিনারা কিচ্ছু পায় না। তখন তার সেই মায়ের প্রসব বেদনা যেমন অস্থিরতা, ঠিক পরিবারের লোকজনেরও অস্থিরতা—যে কোথায় নিয়ে যাবে, কোথায় যাবে, কি করবে? তখন নৌকা নাই, মাঝি নাই, টাকা নাই... দিকবিদিক টেনশন করতে করতে তখন মনে হয় যে—তখন আজরাইলের মুখ দেখবে কিন্তু ডাক্তারের মুখ মনে হয় দেখা হবে না! এই অস্থিরতা ছটফট করতে করতে অনেক মা তখন দেখা যায় যে হয়তো মারাও যায়, মাও মারা যাচ্ছে কিংবা শিশু মারা যাচ্ছে। তাদের জন্যই আসলে আমরা যদি বলি ‘মমতার তরি’।"

তিনি আরও জানান, রাত ১২টার দিকে যখন একটি মায়ের প্রসবের স্বপ্ন মলিন হতে বসে, সেই মলিন স্বপ্নকে রঙিন করার জন্য এবং তাদের আস্থার জায়গা তৈরি করতে কাজ করে যাচ্ছে এই মমতার তরি

২৪ ঘণ্টা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা

২০২১ সাল থেকে এই এলাকায় কাজ শুরু করেছে ‘মমতা প্রকল্প’। এর আগে চরের নারীদের জন্য গর্ভকালীন চেকআপ করা একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত শব্দ ছিল এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে বহু মা ও শিশু অকালে প্রাণ হারিয়েছে

বর্তমানে চরের মায়েদের সচেতন করার পাশাপাশি কমপক্ষে ৪টি নিয়মিত চেকআপ নিশ্চিত করা হচ্ছে স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে। আর কোনো গর্ভবতী মায়ের অবস্থা জটিল হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে এই বিশেষ তরি। প্রকল্পের প্রতিনিধি এর ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেন: "এই তরিটার মাধ্যমে তারা এখানে তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছে। এই তরিটাতে সুন্দর বেড আছে, ব্যবস্থাপনা আছে। তার মাধ্যমে ওনারা যেকোনো সময় ফোন করলে আমাদের যে মিডওয়াইফ আছে তাদের কাছে ফোন করে অথবা মাঝির কাছে ফোন করলে তারা এই নৌকার সেবাটা ২৪ ঘণ্টা পেয়ে যাচ্ছে।"

টাকা ও সময় বাঁচিয়ে কমছে মাতৃমৃত্যুর হার

আগে চরের কোনো রোগীকে গাইবান্ধা সদর বা মূল হাসপাতালে নিয়ে যেতে শুধু নৌকা ভাড়াই লাগত প্রায় ১,৮০০ থেকে ১,৯০০ টাকা। সেই সাথে ঘাটে পৌঁছানোর পর যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের ধাক্কা তো ছিলই। কিন্তু মমতার তরি আসার পর থেকে চরের মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচছে

দরিদ্র পরিবারগুলোকে ঘাট থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার গাড়িভাড়াও এই প্রজেক্ট থেকে সহায়তা করা হয়। ফলে প্রতিটি প্রসূতি মায়ের অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, চরাঞ্চলে মা ও শিশুর মৃত্যুর হার এখন অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে এবং প্রসূতি মায়েরা ঘরে বসেই হাতের মুঠোয় পাচ্ছেন মানসম্পন্ন ও নিরাপদ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা