শত শত নারীর কর্মসংস্থান! অশান্ত এলাকা শান্ত করলেন নাজমুন নাহার শান্তি

নারী উদ্যোক্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন কীভাবে একটি অবহেলিত সমাজের সামাজিক চিত্র এবং পারস্পরিক সম্পর্কের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তার এক অবিশ্বাস্য ও অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নারী উদ্যোক্তা নাজমুন নাহার শান্তি। মাত্র চারজন নারীকে নিয়ে শুরু করা তার একটি ছোট হাতের কাজের উদ্যোগ আজ গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদের প্রায় ১৮০ জন নারীর ভাগ্যবদল করেছে।

৪ জন থেকে ১৮০ জনের পরিবার ও গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান

উদ্যোক্তা নাজমুন নাহার শান্তি জানান, তার এই পথচলার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। তার স্বামী একটি বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) ভালো পদে কর্মরত থাকাকালীন হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিলে তারা কিছুটা আর্থিক ও মানসিক দিক থেকে সংকটে পড়েন। পরবর্তীতে রংপুরে থাকা অবস্থায় চারজন প্রতিবেশী নারী মিলে তারা আড়ংয়ের জন্য বুটিকস ও হাতের কাজ শুরু করেন। তবে সেখানে হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় পারিশ্রমিক ছিল অত্যন্ত সামান্য।

গাইবান্ধায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর পিকেএসএফ (PKSF)-এর এক কর্মকর্তার অনুপ্রেরণায় মাত্র ৪,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যানারে নতুন করে কাজ শুরু করেন শান্তি। কঠোর পরিশ্রম আর সততার বলদিতে আজ মাঠ পর্যায়ে তার নিজেরই কয়েক লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং তার অধীনে প্রায় ১৮০ জন চরাঞ্চল ও গ্রামীণ নারী নিয়মিত কাজ করছেন। এলাকার গৃহিণীরা তাদের সংসারের রান্নাবান্না ও যাবতীয় দৈনন্দিন কাজ শেষ করে যখনই সময় পান—সকালে, বিকেলে কিংবা রাতে—এই হাতের কাজগুলো করে বাড়তি আয় করছেন।

ঝগড়া-বিবাদ বন্ধ: এলাকা শান্ত করলেন 'শান্তি'

নাজমুন নাহার শান্তির এই উদ্যোগ কেবল নারীদের অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয়নি, বরং গ্রামীণ সমাজের দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা দূর করেছে। শান্তি তার এক অনন্য অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, কাজের তদারকি ও কাপড়ের তাগিদ দিতে তিনি যখন সুন্দরগঞ্জের ফকিরপাড়া এলাকায় যান, তখন সেখানকার এক প্রবীণ মুরব্বি তাকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

ওই প্রবীণ ব্যক্তি শান্তিকে জানান যে, এই কাজের সুবাদে গ্রামের নারীদের অলস সময় কাটানো এবং পরনিন্দা ও পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে! নারীরা এখন অলস সময় নষ্ট না করে একে অপরের সাথে কাজের ডিজাইন, সুতো ও সেলাই নিয়ে আলোচনা করেন এবং নিজেরা ব্যস্ত থাকেন। ফলে পুরো এলাকায় এক ধরনের চমৎকার শান্তি ও সম্প্রীতি বিরাজ করছে।

ঈদের আনন্দ ও মানবিক অনুভূতি

কাজের মাধ্যমে নারীদের মুখে হাসি ফোটানোর এক আবেগঘন স্মৃতির কথা উল্লেখ করে এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, একবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের মাত্র চার দিন আগে তিনি গাইবান্ধার বাদিয়াখালীর একটি সমিতিতে নারীদের মজুরি ও পারিশ্রমিক দিতে যান। সেখানে টাকা হাতে পেয়ে এক অভাবী নারী অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে শান্তিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন।

সেই নারী জানান, ঈদের আগে এই টাকাটা না পেলে তিনি তার সন্তানের জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনতে পারতেন না এবং ঈদের সেমাই-চিনির খরচ জোগাতে পারতেন না। নারীদের এমন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার আনন্দ এবং তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর এই মানবিক তৃপ্তিই শান্তিকে প্রতিনিয়ত সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

পণ্যের বৈচিত্র্য, ডিজাইন ও বাজার চাহিদা

নাজমুন নাহার শান্তি শুধু উদ্যোক্তাই নন, তিনি তার পণ্যের মূল ডিজাইনারও বটে। কাপড়ের ওপরে ড্রয়িং, আর্ট ও রঙের বিন্যাস তিনি নিজেই করে থাকেন। তার কালেকশনে রয়েছে সুতোর নিখুঁত নকশি ফোঁড়ের কাজ ও নকশি পাটি ফোঁড়ের আকর্ষণীয় থ্রি-পিস, ওড়নায় ক্রুশ বা কুশিকাটার নান্দনিক লেস, টাই-ডাই করা উন্নত মানের ভয়েল শাড়ি ও পাঞ্জাবি, কুশন কভার এবং সুতোর কাজ ও ক্রুশের সংমিশ্রণে তৈরি রাজকীয় বিছানার চাদর ও নকশি চাদর।

কাজের নিখুঁত বুনন ও কাপড়ের মানের ওপর ভিত্তি করে একেকটি বিছানার চাদর সাধারণত ১,৬০০ টাকা থেকে ২,৪০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়ে থাকে। অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও রুচিশীল হওয়ায় এই নকশি কাঁথা এবং চাদরগুলোর স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা এবং গাইবান্ধার ডিসি অফিসে (জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) প্রচুর প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা রয়েছে।

অদম্য ইচ্ছা আর সততা থাকলে যে ঘরে বসেই শত শত অবহেলিত নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং সমাজকে বদলে দেওয়া সম্ভব, নাজমুন নাহার শান্তি আজ তার এক উজ্জ্বল ও জীবন্ত উদাহরণ।