নিজস্ব প্রতিবেদক: "টাকা নাই যার, সমাজে তার কোনো মূল্য নাই—এটা একদম বাস্তব সত্য। যখন আপনার কাছে টাকা থাকবে, তখন চারপাশের আত্মীয়-স্বজন সবাই আপনার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখবে।" জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে জয় করে এভাবেই নিজের ভাগ্য বদলেছেন সফল নারী উদ্যোক্তা ও ট্রেইনার আনোয়ারা। এক সময় জিরো বা শূন্য হাতে চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটানো আনোয়ারা আজ ব্লক-বাটিকের ছোঁয়া ও কঠোর পরিশ্রমে লাখপতি। এখন তিনি নিজের প্রয়োজনে দুই হাতে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে পারছেন, মেলাচ্ছেন সংসার ও সন্তানদের যাবতীয় আবদার। একই সাথে তার হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন বহু বেকার নারী।
শূন্য হাতে শুরু ও ঘোর অন্ধকার থেকে আলোর পথ
আনোয়ারা জানান, খুব অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পর সংসার ও ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে বেকার বসে থাকার সময় এক গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন তিনি। বাসায় বসে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা থেকে প্রথমে ঘরের পাশে একটি ছোট সেলাই দোকান (সেলাই ঘর) নেন আনোয়ারা। সেখান থেকেই মূলত তার চোখ-মুখ ফুটে ওঠে এবং নতুন জীবনের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে।
ব্যবসার শুরুতে তার পকেটে কোনো পুঁজি বা টাকা ছিল না, এক অর্থে তিনি সম্পূর্ণ জিরো থেকে শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে ছোট অঙ্কের ঋণ নিয়ে কাঁচামাল কেনা শুরু করেন। ধাপে ধাপে সফলতার মুখ দেখায় ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে একপর্যায়ে বড় অঙ্কের 'উদ্যোক্তা লোন' গ্রহণ করেন এবং তা নিয়মিত শোধও করেন। আজ আর তাকে কারো কাছে লোনের জন্য হাত পাততে হয় না, বরং নিজের জমানো পুঁজি দিয়েই অনায়াসে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
বিআরডিবির ট্রেইনার ও নারীদের স্বাবলম্বন
আনোয়ারার জীবনের বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট আসে ২০১৫ সালে, যখন তিনি বিআরডিবিতে (BRDB) ব্লক-বাটিকের ট্রেইনার বা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি বিআরডিবির একজন রানিং ট্রেইনার হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি একাধারে ব্লক-বাটিক, টাই-ডাই, এমব্রয়ডারি এবং হ্যান্ড প্রিন্টের ওপর মেয়েদের দক্ষ করে তুলছেন।
তার এই উদ্যোগের ফলে বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে ১৫ থেকে ১৬ জন নারী কর্মী সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করছেন। শুধু তাই নয়, আনোয়ারার কাছে কাজ শিখে তার ছাত্রীরা আজ নিজেরাও সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন। আনোয়ারার কাছে কাজ শেখা এক নারী আজ ‘উদয়ন’-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে নিজেদের ফিল্ড তৈরি করেছেন, যা আনোয়ারার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কাঁচামাল সংগ্রহ ও আয়ের হিসাব
আনোয়ারা তার ব্লক-বাটিকের কাজের মূল কাঁচামাল যেমন—এক কালারের থান কাপড়, প্রাইজ শাড়ি, ডাই ব্রাশ ও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল সরাসরি ঢাকা এবং বগুড়ার পাইকারি বাজার থেকে সংগ্রহ করেন। নিজে সরাসরি ডিজাইনের তদারকি ও উৎপাদন করার কারণে বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে কাস্টমারদের হাতে পণ্য তুলে দিতে পারেন তিনি। পাইকারি ও খুচরা মূল্যে কম হওয়ায় তার তৈরি করা পোশাকের চাহিদা রংপুর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন নামিদামি আউটলেটে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে।
ব্যবসায়িক লাভের অনুপাত জানিয়ে আনোয়ারা বলেন, ১,০০০ টাকার পণ্য প্রস্তুত করে বাজারে সরবরাহ করলে খরচ বাদে প্রায় ৪০০ টাকা পর্যন্ত নিট বেনিফিট বা লাভ থাকে, যেখানে লোকসানের কোনো সুযোগ নেই। সমস্ত খরচ এবং কর্মীদের মজুরি দেওয়ার পরও প্রতি মাসে তার নিজেরই ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নিট আয় থাকছে।
বিয়ের পর উচ্চশিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেলেও স্বাবলম্বী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে আনোয়ারা নিজের পড়াশোনা থামিয়ে রাখেননি। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে তিনি সফলভাবে ডিগ্রি পাস করেছেন। তার লক্ষ্য সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, কখনো অতীতে ফিরে না তাকানো।
আনোয়ারার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো তার এই বুটিক ও ব্লক-বাটিকের প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বড় পরিসরে রূপ দেওয়া। গ্রামীণ জনপদের নারীরা যেন সারা বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ পেয়ে আয় করতে পারেন এবং কোনো নারীকে যেন আর আনোয়ারার মতো অতীতে হতাশার মুখোমুখি হতে না হয়, সেই ফিল্ড তৈরি করাই আনোয়ারার মূল স্বপ্ন।