শখের মাছ মরে গেলেও হার মানেননি কলেজ ছাত্র! রঙিন মাছ চাষে তরুণের নতুন অনুপ্রেরণা

রঙিন মাছ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শুরুটা হয়েছিল নিছক শখের বশে, কিন্তু প্রথমবারেই অনভিজ্ঞতার কারণে নেমে এসেছিল বড় বিপর্যয়—মারা গিয়েছিল শখের সবকটি মাছ। তবে সেই বড় ধাক্কায় ভেঙে না পড়ে, নতুন উদ্যোমে পুনরায় কাজ শুরু করে আজ রঙিন মাছ চাষে সফলতার মুখ দেখছেন গাইবান্ধার এক কলেজ ছাত্র। অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাদের ওপর ছোটখাটো হাউস তৈরি করে রঙিন মাছের প্রজেক্ট গড়ে তুলেছেন তিনি

শখ থেকে হোঁচট ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

উদ্যোক্তা জানান, ছাত্র অবস্থায় পরিবারের কাছ থেকে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নিয়ে তিনি প্রথমবার রঙিন মাছ কিনে এনেছিলেন। কিন্তু পানির আর্দ্রতা ও খাদ্যের সঠিক নিয়ম না বোঝার কারণে কিছুদিন পরেই তার সব মাছ মারা যায়। শখের মাছগুলো হারিয়ে প্রচণ্ড কষ্ট পেলেও তিনি হাল ছাড়েননি

পুনরায় কিছু মাছ নিয়ে এসে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচর্যা শুরু করেন। গাপ্পি মাছের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এরা বাচ্চা দেওয়ার পরপরই নিজেদের বাচ্চা নিজেরাই খেয়ে ফেলে। তাই তিনি প্রজননের পর দ্রুত বাচ্চাগুলোকে নেট দিয়ে আলাদা করার কৌশল রপ্ত করেন। প্রথম দিকে পরিবার থেকে "সময় নষ্ট" করার বিষয়ে কিছুটা মানসিক চাপ থাকলেও, বর্তমানে তার প্রজেক্টে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০টি বাচ্চার সমাগম দেখে পরিবারের সবাই এখন বেশ খুশি

ছাদের ওপর অভিনব হাউজ প্রজেক্ট

সাধারণত অনেকে মাটিতে বা ঘরের নিচে অ্যাকোয়ারিয়াম বা ট্যাংকে এই চাষ করলেও, এই তরুণ আলো-বাতাসের উপযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ছাদের ফাঁকা জায়গাটিকে বেছে নিয়েছেন। প্রথমে ককশিট ও ছোট গামলায় শুরু করলেও বাচ্চার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনি পাকা হাউজের পরিকল্পনা করেন

তিনি জানান, বাড়িতে যখন রাজমিস্ত্রির কাজ চলছিল, তখন বাবাকে বুঝিয়ে এবং একটু জোর করেই ছাদের ওপর দুটি পাকা হাউজ তৈরি করে নেন। বাবার অর্থায়নেই এই হাউজগুলো নির্মিত হয়, যেখানে বর্তমানে এক পাশে প্যারেন্টস (মা-বাবা) মাছ এবং অন্য পাশের হাউজে ছোট বাচ্চা মাছগুলোকে আলাদা করে বড় করা হচ্ছে

মাছের প্রজাতি ও আয়ের সমীকরণ

বর্তমানে তার এই ছাদ-খামারে বেশ কয়েক প্রকার রঙিন মাছ রয়েছে:

  • মাছের জাত: গাপ্পি (Guppy), মিক্স গাপ্পি, আরটিডব্লিউ (RTW/আরটিভি) কোয়ালিটি, ব্ল্যাক মলি (Black Moly), হোয়াইট মলি (White Moly) এবং প্লাটি (Platy) মাছ

  • বিক্রি ও আয়: মাছের বাচ্চাগুলো সাধারণত ২০ থেকে ৩০ টাকা জোড়া বিক্রি হয়। মিক্স গাপ্পিগুলো ৪০, ৫০ থেকে ৬০ টাকা জোড়া এবং ভালো জাতের আরটিডব্লিউ মাছগুলো প্রতি জোড়া ২০০ থেকে ৩০০ এমনকি ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব। সব খরচ বাদ দিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি স্থানীয় শৌখিন মানুষের কাছে মাছ বিক্রি করে বর্তমানে মাসে তার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাড়ির পিছনের ফাঁকা জায়গায় আরও ৩-৪টি বড় হাউজ করে এই প্রজেক্টকে বাণিজ্যিকভাবে বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে তার

রঙিন মাছের বিশেষ পরিচর্যা ও পানির লেভেল

রঙিন মাছ টিকিয়ে রাখার প্রধান কৌশল হলো সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা। তরুণ উদ্যোক্তা তার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন:

  • পানি পরিবর্তন: হাউজের পুরো পানি একসাথে কখনো ফেলে দেওয়া উচিত নয়। মাছের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুবিধার জন্য কিছু পুরাতন পানি রেখে তারপর আংশিক পানি পরিবর্তন করতে হয়। সম্পূর্ণ নতুন পানিতে মাছ ছাড়লে তারা প্রচণ্ড চাপের (Pressurized) মুখে পড়ে এবং মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে

  • প্রাকৃতিক খাদ্য ও উদ্ভিদের ভূমিকা: হাউজে কিছু জলজ উদ্ভিদ বা ঘাস রাখা জরুরি, যা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে পানির ভেতরে প্রাকৃতিক প্ল্যাঙ্কটন বা খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে। পানির রঙ যখন হালকা নীলচে সবুজ হবে, তখন বুঝতে হবে পানি ঠিক আছে। তবে পানি যদি অতিরিক্ত গাঢ় নীল বা কালো হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে পানিতে ভাইরাস আক্রমণ করেছে বা অতিরিক্ত খাদ্য জমে নষ্ট হয়েছে; তখন দ্রুত পানি পরিবর্তন করতে হবে