ভিক্ষুক নেই, দিনমজুরও নেই! সবাই হয়ে গেছেন সফল সবজি চাষী: চরের অবিশ্বাস্য গল্প

সবজি চাষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মেহনত আর সঠিক কর্মসংস্থান কীভাবে একটি পুরো সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারে, তার এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাইবান্ধা ও বগুড়া অঞ্চলের চরাঞ্চলের কৃষকেরা। একসময় যে এলাকায় অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী ছিল, আজ সেখানে কোনো ভিক্ষুক বা দিনমজুর খুঁজে পাওয়া ভার। চরের প্রতিটি মানুষ এখন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন এবং নিজেদের ভাগ্যবদল করেছেন

ভিক্ষুক ও অলস মানুষহীন এক আদর্শ গ্রাম

চরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে স্থানীয় এক সফল ও প্রবীণ চাষী অত্যন্ত গর্বের সাথে জানান: "না না, ভিক্ষুক নাই! ভিক্ষায় যেত দিলে বলে পাওয়া যায় না, ফকির নাই! এলাকায় ফকির নাই, সব বড়লোক হয়ে গেছে... একটা ফকির যে হাক ছাড়া ফকির হয়, হাল দেয়—সে ফকির নাই। অন্য এলাকা থেকে দুই-চার জন ছাওয়া-পোয়া (বাচ্চা) আসে, কিন্তু এই এলাকায় নেই।"

তিনি আরও জানান, গ্রামে এখন অন্যের জমিতে দৈনিক চুক্তিতে কাজ করার মতো সাধারণ কিষাণ বা দিনমজুরও পাওয়া যায় না। কারণ, যাদের নিজস্ব জমি নেই, তারা অন্যের জমি বর্গা বা লিজ (বকরা) নিয়ে নিজেরাই দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন। প্রত্যেকেই নিজের কাজ নিয়ে চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন

ভ্যান চালক থেকে কোটিপতি ও রেমিট্যান্সের ছোঁয়া

কৃষকদের এই অভাবনীয় উত্তরণের একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, চরের অনেক মানুষ আগে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরবর্তীতে তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবং নিজেদের সঞ্চয় খাটিয়ে ২-৪ শতক করে জমি বর্গা নিয়ে সবজি চাষ শুরু করেন। পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ তাদের অনেকের ঘরের সন্তানরা বিদেশে (প্রবাসী) গিয়ে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন এবং চরের বহু পরিবারে এখন ১০ লাখ, ১৫ লাখ বা ২০ লাখ টাকার সম্পত্তি ও ব্যাংক ব্যালেন্স রয়েছে

সবজি চাষে বিপ্লব ও প্রতিদিনের হাট

বাপ-দাদার আমল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ বেগুন, পটল ও মরিচ চাষের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে গত চার-পাঁচ বছর ধরে তারা নতুন করে ফুলকপি ও বাঁধাকপির মতো রবিশস্যের আবাদ শুরু করেছেন, যা তাদের আয়ের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মদন চর, বালুপাড়া, গোবিন্দগঞ্জ, নেয়ামতপুর, ঘোড়ামারা, মাস্তা ও বক্সচরসহ বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন সবজি চাষের প্রধান জোনে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো চরে সবজির পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে আখ বা কুশার চাষও করা হয়

নিজের চাষাবাদের বৈচিত্র্য সম্পর্কে প্রবীণ ওই চাষী বলেন: "আমি কাঁকরোল, পটল, কালাই, কপি, মূল (মুলা), করোলা, তারপরে বটবটি (বরবটি) কালাই—সব ফসল আমি করি, কোনটা বাদ দেই না। কম করে হলেও কম কম কম কম করে সব ফসল আমি করি। সব ফসল আবাদ করে আমি প্রত্যেক হাট, প্রতিদিন হাট করি। প্রতিদিন হাট করে আল্লাহর রহমত আমার ইনশাল্লাহ এত লাভবান।"

ফসলের আয়ে ৩০ লাখ টাকার বাড়ি ও জমি ক্রয়

সবজি চাষ ও গবাদি পশু পালন করে এই প্রবীণ চাষী তার নিজের জীবনের অবিশ্বাস্য সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন। তিনি ফসলের আয় থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ৯ বিঘা জমি কিনেছেন। এছাড়া পাকা বাড়ি তৈরিতে তার ইতিমধ্যে ৩০ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে নতুন বাসা করার জন্য আরও কয়েক শতক জমিও কিনেছেন তিনি

সবজি চাষে কঠোর মেহনতের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাদের আর্থিক অবস্থা উন্নত হওয়ার কারণে স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে এবং এলাকার মসজিদের অবকাঠামো অত্যন্ত আধুনিক ও উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। নিজের এই অভাবনীয় সাফল্যের শুকরিয়া ও আনন্দ প্রকাশ করতে সম্প্রতি তিনি একটি গরু ও খাসি জবাই করে প্রায় ৩,০০০ মানুষের এক বিশাল ধর্মীয় মজলিশের (ভোজের) আয়োজনও করেছিলেন