নিজস্ব প্রতিবেদক: ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি (MRP) থেকে কম দামে ওষুধ বিক্রি করে দরিদ্র রোগীদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন গাইবান্ধার এক ফার্মেসি ব্যবসায়ী। কিন্তু অসহায় মানুষের প্রতি এই সহমর্মিতাই যেন তার জীবনে ডেকে আনে চরম বিপদ ও মানসিক হয়রানি। ওষুধ ব্যবসায়ী সংগঠনের সিন্ডিকেটের চাপ, ড্রাগ সুপারের হয়রানির চেষ্টা এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর বলপ্রয়োগের কারণে দীর্ঘ দুই বছর দোকানে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রাখাসহ আদালতের বারান্দায় কাটানো এক সংগ্রামী কাহিনী উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
গাইবান্ধার মন্ডল মেডিকেলের স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সোসাইটি (BCDS)-এর সাধারণ সদস্য ওই ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ওষুধের বাজারে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর চলা অদৃশ্য জুলুমের এক বিস্ফোরক সত্য তুলে ধরেন।
এমআরপি’র আড়ালে গ্রাহকদের ওপর জুলুম ও প্রতিবাদ
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের মার্চ মাসের দিকে। তৎকালীন বিসিডিএস (BCDS)-এর কার্যনির্বাহী কমিটি (সভাপতি ও সিনিয়র সহ-সভাপতি) মিটিংয়ে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেন যে—সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে এমআরপি (Maximum Retail Price) বা গায়ের দামেই ওষুধ বিক্রি করতে হবে, এক টাকাও কম রাখা যাবে না।
দরিদ্র অঞ্চলের সাধারণ রোগীদের কথা চিন্তা করে মন্ডল মেডিকেলের মালিকসহ কয়েকজন কেমিস্ট এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাদের যুক্তি ছিল, এমআরপি থেকে ছাড় না দিলে দরিদ্র মানুষ চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে পারবে না এবং পাঁচ দিনের ওষুধ মাত্র দুই দিন কিনে বাড়ি ফিরবে। এই প্রতিবাদের কারণে ব্যবসায়ী সংগঠনের রোষানলে পড়েন তিনি। তারা অভিযোগ তোলে, মন্ডল মেডিকেল সংগঠনের নিয়ম-পরিপন্থী কাজ করছে এবং তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে।
লাইসেন্স বাতিলের চেষ্টা ও ২ বছর ওষুধ সরবরাহ বন্ধ
কম দামে ওষুধ বিক্রি অব্যাহত রাখায় মন্ডল মেডিকেলের স্বত্বাধিকারীর ওপর নেমে আসে নানামুখী হয়রানি। তিনি বলেন: "তারা সেন্ট্রালে আমার লাইসেন্স বাতিলের জন্য আবেদন করে, তারা প্রশাসন দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করে। ড্রাগ সুপার কর্তৃক আমাকে একাধিকবার হয়রানির চেষ্টা করে... আমার ওষুধ কোম্পানি কর্তৃক একটা অসাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়। ওষুধ কোম্পানিরা আমার এগেনেস্টে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আমার দোকানে প্রায় দুই বছর ওষুধ দেওয়া বন্ধ রাখে।"
কিন্তু এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের উদ্দেশ্য থেকে পিছুপা হননি। বড় কোম্পানিগুলো ওষুধ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে তিনি কিছু আন্তরিক কোম্পানির সাহায্য নেন এবং বিভিন্ন হোলসেল (পাইকারি বাজার) থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে গ্রাহকদের কম দামে দেওয়া অব্যাহত রাখেন।
এমআরপির আসল গণিত ও হাইকোর্টে আইনি লড়াই
ওষুধের দামের ভেতরের লাভ-ক্ষতির অংকটি পরিষ্কার করে এই ব্যবসায়ী বলেন: "এমআরপি যদি ১০০ টাকা লেখা থাকে, আমি যদি ৯০ টাকা নিই আমার তারপরও তিন থেকে চার টাকা পাঁচ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। আর যদি একটা মানুষ এমআরপিতে ১০০ টাকায় কেনে, তাহলে তার ১৪ থেকে ১৩ টাকা লস হয়।"
একটি অ্যান্টি-আলসার (গ্যাসের) ওষুধের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ১২টি বড়ির এক পাতার তৎকালীন খুচরা বাজারমূল্য যদি ১২০ টাকা হয় আর একজন সাধারণ কেমিস্ট যদি সেটি ১০৮ টাকা পাতাও বিক্রি করেন, তাহলেও কেমিস্টের ৭ থেকে ৮ টাকা লাভ থাকে। অথচ ক্রেতার থেকে পুরো ১২০ টাকা নেওয়া হলে দরিদ্র রোগীর সরাসরি ১০-১২ টাকা ক্ষতি হয়।
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে একাধিক মামলা করেন। দীর্ঘ দুই বছর আইনি লড়াই চালানোর পর মহামান্য আদালত তার পক্ষে রায় দেন এবং তাকে স্বাভাবিক নিয়মে ওষুধ সরবরাহ করার নির্দেশ দেন। তবে এর বিরুদ্ধে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা পুনরায় আপিল ও স্টে-অর্ডার নেওয়ার চেষ্টা চালান।
সাধারণ কেমিস্টদের প্রতি বার্তা: "ভয় পাবেন না"
দেশের বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সাধারণ ওষুধ ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে সাহস জুগিয়ে এই প্রতিবাদী ব্যবসায়ী বলেন, এখন আর সাধারণ কেমিস্টদের মনে কোনো ভয় বা আতঙ্ক থাকার প্রয়োজন নেই। ক্রেতা ও রোগীদের স্বার্থে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিয়মের মধ্যে থেকে ব্যবসা করতে পারেন। তিনি আহ্বান জানান: "আপনার ব্যবসা আপনি স্বাধীনভাবে করবেন, আপনার ব্যবসা আপনি নিয়মের মধ্য থেকে করবেন। ভালো ওষুধ কম দামে দেবেন, নিজে বাঁচবেন—নিজে যতটুকু প্রফিট করার মাধ্যমে নিজের পরিবারকে বাঁচাবেন; সাধারণ ক্রেতাসহ ওষুধ ক্রেতা যারা আসে, রোগীদেরকে বাঁচাবেন।"
সর্বোপরি, ওষুধের প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ মূল্য বা এমআরপি থেকে কিছুটা কম দামে ওষুধ বিক্রি করে অসহায় অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজে এবং অন্য সকল কেমিস্টদের নিয়মিত উৎসাহিত করে যাচ্ছেন এই সাহসী সমাজহিতৈষী ব্যবসায়ী।