নিজস্ব প্রতিবেদক: তীব্র গরমে পোল্ট্রি খামারের মুরগি বাঁচিয়ে রাখা এবং উৎপাদন ঠিক রাখা দেশের খামারিদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে চীনে খামারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আধুনিক এয়ার কন্ডিশন বা এসি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সেই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। এই সংকটকে জয় করতে ইউটিউব দেখে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে মুরগির ঘরের চালের ওপর কৃত্রিম 'ঝরনা' পদ্ধতি চালু করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গাইবান্ধার এক সফল খামারি।
ইউটিউব দেখে চীনের প্রযুক্তিকে দেশীয় রূপান্তর
খামারের মালিক জানান, তীব্র রোদে যখন টিনের চাল অতিরিক্ত গরম হয়ে ওঠে, তখনই তিনি এই কৃত্রিম ঝরনাটি চালু করে দেন। তিনি বলেন: "টিন যখন হিট হয় এবং আবহাওয়া যখন উত্তপ্ত হয় তখন এই পানিতে পড়ে টিনটা ঠান্ডা থাকে এবং মুরগির ঘর ঠান্ডা থাকে এই কারণে ঝরনাটা দেওয়া। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ঝরনাটা দিতে হয়। এটা আমি YouTube-এ দেখিয়া... চীন দেশের প্রায়গুলা এখানে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য এয়ার কন্ডিশন ঘরে রাখে ওরা মুরগি। আর আমরা তো গরিব দেশ আমাদের তো পরিবেশ নাই, কারণে থাকে না সময় সময়। এইজন্য আমরা এটা করছি।" বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দূর থেকে মাটির নিচ দিয়ে পাইপ টেনে এই ঝরনা এবং আধুনিক পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ঝরনা, ড্রপ পদ্ধতি ও পাইপ কিনতে খামারির খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
শ্রম ও খরচ কমাতে অটোমেটিক 'ড্রপ' ও খাদ্য পদ্ধতি
খামারের উৎপাদন বাড়াতে এবং শ্রমিকের খরচ কমাতে তিনি সনাতন বাটি পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক 'নিপল ড্রিংকার' বা 'ড্রপ' পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। এতে মুরগির রোগবালাই যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে শ্রমিকের খাটুনিও। তিনি উল্লেখ করেন: "বাটির পরিবর্তে ড্রপ দেওয়া হয়েছে এখানে... আগে বাটি দিছিলাম, এখানে বাটি ছিল এখন বাটি নাই। ড্রপের মাধ্যমে পানি খায়। এখন খাদ্য সহজ হইছে, খাদ্য শুধু দুই বেলা দেই, দুই বেলা দিলেই আর কোন কিছু দেওয়ার দরকার হয় না। পানি ওরা নিজেরাই খায়। অনেক শ্রমিক খরচ বাঁচে এবং রোগবালাই কম হয়। মানে বাটিতে দিলে কি—খাদ্য খায় মুখে মুখে, খাদ্যের ওখানে লালা পড়ে পড়ি ওখানে গন্ধ ওঠে।"
ডিম উৎপাদন ও বাজারের লাভ-ক্ষতির হিসাব
খামারটিতে প্রায় ১,০৮০টি মুরগি পালনের শেড রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর নতুন মুরগি তোলা এবং পুরোনো মুরগি বিক্রি করা হয়। খামারি জানান, মুরগি সাধারণত ১৯ সপ্তাহে (সাড়ে চার মাস) ডিম পাড়া শুরু করে এবং একটানা ১৮ থেকে ২০ মাস পর্যন্ত লাভজনকভাবে ডিম দেয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে এটি ২৬ মাস পর্যন্তও নেওয়া সম্ভব। ডিম উৎপাদনের হার প্রথম দিকে ৯০% থেকে ৯৫% পর্যন্ত থাকে এবং পরবর্তীতে তা ৮০-৮৫ শতাংশে এসে স্থিতি পায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকাররা সরাসরি খামার থেকে ডিম সংগ্রহ করে নিয়ে যান। প্রতি ১০০ ডিমের পাইকারি বাজার দর ১,০৫০ টাকা (ভিডিওর সময়কালীন দর)। এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অন্যান্য আয়ের পাশাপাশি শুধু এই মুরগির খামার থেকেই তার প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট আয় থাকে।