৫৫ বছর ধরে কবর কাটেন টুলু! ১৫ হাজার কবর বানানোর পর জানালেন গা শিউরে ওঠা রহস্য

কবর

নিজস্ব প্রতিবেদক: মৃত্যু চিরন্তন সত্য, আর মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা হয় সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর তথা কবর। গাইবান্ধার এমন একজন মানুষ হলেন আলহাজ্ব মো. টুলু মিয়া (টুলু), যিনি দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও নিঃস্বার্থভাবে কবর খনন এবং কাফন-দাফনের কাজ করে আসছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১৫,০০০-এরও বেশি মানুষের শেষ শয্যা নিজের হাতে তৈরি করেছেন তিনি। পাশাপাশি রেললাইনে কাটা পড়া, নদী থেকে ভেসে আসা বা পুলিশের উদ্ধার করা হাজারেরও বেশি বেওয়ারিশ লাশের গোসল, কাফন ও জানাজা দিয়ে দাফন সম্পন্ন করেছেন সম্পূর্ণ একাইগাইবান্ধার এই সাহসী ও প্রবীণ ব্যক্তিত্বের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা এবং কিছু অলৌকিক ও গা শিউরে ওঠা ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে

কবরের ভেতর থেকে ধোঁয়া ও অন্ধকার হওয়ার সেই রহস্যময় ঘটনা

টুলু মিয়া তার জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও গা শিউরে ওঠা ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ১৯৭২ সালের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। গাইবান্ধার বড় মসজিদের মুয়াজ্জিন আব্দুল হামিদ সাহেবের জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া চলাকালীন ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি বলেন: "উনাকে যখন কবরে রাখি, ওই কোমরে যখন আত্মীয়-স্বজন কবরের নিচে নামাইছে, তখন এদিকের মাটির চাপড়া ভেঙে গেছে, ওদিকের পাড় ভেঙে যাওয়ার পরে লোকগুলো ঝাঁপ দিয়ে ওঠার পরে... আমি স্টিল ভালো পাশে দাঁড়িয়ে আছি, আমি সহযোগিতা করতেছি... কবর থেকে বিরাট একটা ধুমা বের হলো। সাদা ধুমা, কেউ কাউকে আর দেখি না, অন্ধকার! ধুমাটা যখন ৫০ ফিট উপরে গেল, ওটা আস্তে আস্তে কালো হয়ে গেল।"

তিনি আরও জানান, ধোঁয়া একটু পরিষ্কার হওয়ার পর দেখা যায় ভয়ের চোটে খাটিয়ার পাশে থাকা সমস্ত মানুষ মেইন গেটের দিকে দৌড়ে পালিয়েছে, কেবল ইমাম সাহেব দূর থেকে তাকে ডাকছিলেন। পরে রাত ৯টার দিকে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আত্মীয়-স্বজনেরা এসে কোনোমতে মাটি ভরাট করে চলে যান

এছাড়া তিনি আরেকটি ঘটনার কথা জানান, একবার একটি কবর ভেঙে গেলে ভেতরের লাশটি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় এবং কাফনের কাপড় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। পরে তার সিনিয়রদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন, প্রায় ১৪ বছর আগে ওই ব্যক্তিকে দাফন করা হয়েছিল এবং তিনি একজন অত্যন্ত সৎ ও আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন

৬ বছর বয়স থেকে কবর খননের হাতেখড়ি ও ভয় জয়

টুলু মিয়ার কবর কাটার শুরুটা হয়েছিল মাত্র ৬ বছর বয়স থেকে। নিজ এলাকার রমজান মিয়া নামের এক ওস্তাদের সাথে গোরস্থানে আসতে আসতেই মূলত এই কাজ শেখেন তিনি। প্রথম দিকে কিছুটা হিমশিম খেলেও মনের এক গভীর উপলব্ধি তার সব ভয় দূর করে দেয়। তিনি ভাবেন, মানুষ মারা গেলে তার আর কোনো পার্থিব ক্ষমতা থাকে না। এই বোধ জাগ্রত হওয়ার পর থেকে একাই গভীর রাতে লাশের পাশে শুয়ে থাকা কিংবা পচা-গলা, পোকা ধরা বা ফাঁসি দেওয়া লাশ কোনো প্রকার দ্বিধাবোধ ছাড়াই দাফন করার অসীম সাহস পান তিনি। প্রায় ৩১ বছর তিনি গাইবান্ধা গোরস্থানে একাই বাঁশ কাটা, কবর খনন ও দাফনের যাবতীয় কাজ সামলেছেন

সওয়াবের আশায় জীবনের বড় আত্মত্যাগ

টুলু মিয়া পূর্বে ডিফেন্সে চাকরি করতেন এবং ১৯৬০ সালের সার্টিফিকেট দিয়ে পুলিশে যোগদান করে এএসআই (ASI) পদমর্যাদা পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। কিন্তু গোরস্থানের ইমাম সাহেবের মুখে একটি হাদিস বা আলোচনা শুনে তার পুরো জীবন বদলে যায়। ইমাম সাহেব বলেছিলেন— কবরে এক মুষ্টি মাটি দিলে জমিন থেকে আসমান সমান বিশাল ‘ওহুদ পাহাড়’ সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়। এই সওয়াবের আকর্ষণে এবং বাবার ইচ্ছায় তিনি পুলিশের চাকরি থেকে ইস্তফা (Resign) দিয়ে ছোট ভাইয়ের কাপড়ের দোকানে বসেন এবং স্থায়ীভাবে কবর খননের সেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন

ব্যক্তিগত জীবন ও গোরস্থানকে সুন্দর করার স্বপ্ন

ব্যক্তিগত জীবনে টুলু মিয়ার ৫ জন কন্যাসন্তান রয়েছে (ছোটবেলায় ও মায়ের পেটে আরও দুইজন মারা যায়)। অত্যন্ত অভাব-অনটনের মাঝেও তিনি মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন, যার মধ্যে চারজন এমএ (MA) এবং একজন বিএ (BA) পাস করেছেন। তৎকালীন ডিসি সাহেবের সহায়তায় তার দুই মেয়ের সরকারি চাকরিও হয়েছিল। তবে বর্তমানে গোরস্থান থেকে তাদের যে সামান্য ৮-১০ হাজার টাকা সম্মানী বা মানুষের দেওয়া বকশিশের টাকা কয়েকজন মিলে ভাগ করে নেন, তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনেকেই তাদের নিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জনের অপবাদ দিলেও টুলু মিয়া বুক ফুলিয়ে বলেন, ৫৫ বছরের ইতিহাসে তিনি আজ পর্যন্ত দাফন বাবদ কারও কাছে একটি টাকাও চেয়ে নেননি; মানুষ যা খুশি মনে দেয়, তাই গ্রহণ করেন

টুলু মিয়ার একটি বড় শখ হলো গোরস্থানকে ফুলের বাগান বানিয়ে রাখা। পূর্বে নিজ উদ্যোগে ও বিভিন্ন মানুষের সহায়তায় ডালিয়া, গোলাপ, গাঁদা ও ঘাসফুল লাগিয়ে পুরো গোরস্থান চমৎকার করে সাজিয়েছিলেন, যা দেখে তৎকালীন ডিসি সাহেবও মুগ্ধ হয়ে চারার আবদার করেছিলেন। তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে মাত্র এক মাসের মধ্যে পুরো গোরস্থানটিকে আবারও ফুলের বাগান বানিয়ে দিতে সক্ষম তিনি