উত্থান-পতন পেরিয়ে বাংলাদেশের প্রথম সিরামিক কারখানার গল্প

তাজমা সিরামিক

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বাংলাদেশের ভারী শিল্পের ইতিহাসে উত্তরের জেলা বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—‘তাজমা সিরামিক’। ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারখানাটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সিরামিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময়ের উত্থান-পতন, বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পুনরায় চালু হওয়ার এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস নিয়ে আজও টিকে আছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই শিল্পের পুনর্জাগরণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও স্বপ্নদ্রষ্টা যখন দেশে ভারী শিল্পের ধারণা খুব একটা ছিল না, তখন আমদানিনির্ভর বাজারে দেশীয় উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেছিলেন আব্দুল জাব্বার প্রামাণিক ও তার পরিবার। মূলত বিড়ি ব্যবসা থেকে উঠে আসা এই উদ্যোক্তা পরিবারটি সাহসের সাথে সিরামিক শিল্পে বিনিয়োগ করেন। কারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করার সাথে সাথে দেশেই তৈরি হতে থাকে সিরামিকের প্লেট, কাপ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।

সংকট ও বন্ধ হয়ে যাওয়া সময়ের সাথে সাথে জ্বালানি সংকট, ফার্নেস অয়েলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে তাজমা সিরামিকের উৎপাদন থমকে যায়। এক পর্যায়ে ২০০১ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কারখানার চাকা। মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি আর নিস্তব্ধ চিমনি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি যখন হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখনই শুরু হয় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম।

নতুন করে পথচলা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৯ সালে তাজমা সিরামিকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়। এরপর আবার জ্বলে ওঠে চুল্লি, ঘুরতে শুরু করে মেশিন। বর্তমানে এই কারখানাটি বছরে প্রায় ১২ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করছে। বগুড়ার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২৫০ জন শ্রমিক কর্মরত আছেন, যার একটি বড় অংশই নারী। বহু পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে এই কারখানাটি।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সফলভাবে ফিরে আসলেও বর্তমানে কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। গ্যাসের নিম্নচাপ, কাঁচামাল আমদানির চড়া খরচ এবং বৈশ্বিক বাজারের প্রতিযোগিতার কারণে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। তবে সব বাধা পেরিয়ে দেশীয় পণ্যের বাজার আরও বড় করার স্বপ্ন দেখছে তাজমা সিরামিক।

তাজমা সিরামিকের চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া আজও মনে করিয়ে দেয়—এটি কেবল একটি কারখানা নয়, এটি আমাদের শিল্প ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক এবং অদম্য মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন।