এক গলায় ৫০টি প্রাণীর আওয়াজ! বিস্ময়কর প্রতিভা।
প্রতিভা
এখন শীতকাল। আমি হরবেলার শুরুতেই শীতকালের কিছু পাখি ও পশুদের কণ্ঠ আপনাদের শোনাবো। আসুন, প্রথমেই শুনি এই পাখিটির ডাক। আসলে এটি হচ্ছে ঘুঘু পাখি। এবার শুনুন কবুতরের ডাক। আজান এলে পরপর মোরগ ডাকে। এবার মুরগি যখন ডিম দেবে, তার আগে কেমন শব্দ করে? আর যখন মুরগি ডিম দিয়ে ফেলে, তখন চিৎকার দিয়ে ওঠে।
মুরগির বাচ্চা যখন ফুটে বের হয়, খাবার খোঁজে এবং খায়—তখন শব্দগুলো কেমন হয়, আসুন সেটি শোনাই। এমন সময় চিল বা বেজি এলে মুরগি চিৎকার দিয়ে ওঠে। এবার আসুন আরেকটি পরিচিত পাখির ডাক শোনাই—এটি হচ্ছে কাক। এবার চড়ুই পাখির ডাক।
এবার আমরা পশুদের ডাক শোনাই। যখন কুকুরছানাটি একটু বড় হয়, তখন সে ভুঁ ভুঁ করে ডাকতে শেখে। আবার ছোট কুকুরটি বড় হয়ে গেলে কেমন জোরে ডাকে, সেটাও শোনাই। কুকুরের মধ্যে দুটি শ্রেণি আছে—একটি পুরুষ, আরেকটি মেয়ে কুকুর। আসুন, দুটি কুকুরের ঝগড়া কেমন হয় তা শোনাই। এমন সময় কেউ বিরক্ত হয়ে একটি কুকুরকে মার দিলে, মার খেয়ে সে কেমন চিৎকার করে চলে যায়।
এবার আসুন আকালী কুকুরের ডাক কেমন হয় তা শোনাই। এবার শিয়ালের ডাক। বিড়ালের বাচ্চা কেমন করে ডাকতে হয়? বিড়ালের মা কেমন করে ডাকে? বড় বিড়ালের ডাক। বিড়ালের ঝগড়া। গভীর বনে সিংহের ডাক।
এবার আসুন আরও কিছু পশুপাখির ডাক শোনাই। প্রথমেই ছাগলের ডাক। এরপর গরুর ডাক। পাখিদের মধ্যে হাঁসের ডাক। ভোরের পাখির ডাক। বর্ষাকালে ব্যাঙের ডাক। ব্যাঙ যেমন ডাকে, আর ব্যাঙকে সাপ ধরলে তখন কেমন শব্দ করে—দুটোই আপনাদের শোনাই।
এবার আসুন তান্ত্রিকদের মধ্যে কিছু শব্দ শোনাই। প্রথমে প্রেসার কুকারের শব্দ—যখন সময় হয়ে যায়, তখন কেমন সিটি দেয়। এরপর তাওয়ায় ডিম ভাজার সময় কেমন আওয়াজ হয়। মানুষের বাচ্চা যখন প্রথম মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়, তখন কেমন আওয়াজ করে।
দাদিমা কিভাবে কথা বলে, আসুন এবার আমাদের রংপুর আঞ্চলিক ভাষায় শোনাই। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধ করেছে। রক্তক্ষয়ী নয় মাস যুদ্ধের পর আমরা স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছি। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্রের যে আওয়াজগুলো ছিল, সেগুলোও এবার আপনাদের শোনাবো।
মুক্তিযুদ্ধের দিনের কথাগুলো আমি শব্দের মধ্য দিয়ে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আসলে এটি আমি একা একাই রপ্ত করেছি। এই পশুপাখির ডাক করতে গিয়ে আমার বাসার গাছে একটি কামরাঙ্গার গাছ ছিল। সেই গাছে একটি কোকিল বসত। আমি টু বললে কোকিলটিও টু টু বলে উত্তর দিত। এভাবেই প্রথমে কোকিলের সঙ্গে আমার সুর ভাঙে।
এরপর কাক, মুরগি, শিয়াল, বিড়ালসহ নানা পশুপাখির ডাক আমি ধীরে ধীরে রপ্ত করে ফেলি। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষ আমার এই হরবেলা শোনার জন্য অপেক্ষা করত। মাইক্রোফোনে আমার নাম ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকরা চিৎকার করে বুঝে নিত—এখন মজার কিছু আসছে।
দর্শকদের সেই অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি আমার মনের মাধুরী মিশিয়ে শব্দগুলো উচ্চারণ করতাম। আমি যখন প্রথম হরবেলা শিখি, কুকুরের ডাক শিখেছিলাম। একদিন ভোরবেলা রাস্তায় কুকুরের ডাক ডাকতে ডাকতে হঠাৎ পিছন থেকে একটি পাগলা কুকুর এসে আমাকে কামড়ে দেয়।
আমার এখন প্রায় ৫০টিরও বেশি শব্দ চয়ন করা আছে, যেগুলো আমি রপ্ত করেছি। আজকে হয়তো সব বলতে পারিনি, কিন্তু আমি পারি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে একবার এবং ‘নিবেদন’ ও ‘রংধনু’ নামে দুটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে মোট তিনবার আমি হরবেলা পরিবেশন করেছি। রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে আমি হরবেলা ও হরবেলা কৌতুক পরিবেশন করেছি।
আমাদের মতো শিল্পীদের জন্য, যারা গাইবান্ধাসহ সারা বাংলাদেশে হরবেলা চর্চা করছেন, তাদের জন্য একটি ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন। আমাদের টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ যদি হরবেলা শিল্পীদের নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করে, তাহলে এই শিল্পীরা যেমন তাদের চর্চা চালিয়ে যেতে পারবে, তেমনি দর্শক-শ্রোতারাও এই বিনোদনের স্বাদ পাবে। তাহলেই আমাদের এই শিল্পীসত্তার প্রকাশ ঘটবে এবং নতুন নতুন হরবেলা শিল্পী সৃষ্টি হবে।



