ব্যাংকার লিখন চৌধুরীর সিনেমা ভান্ডার

আমি প্রতিদিন রাতেই কোনো না কোনো ছবি দেখে ঘুমাই। সাউথ ইন্ডিয়ান ছবি হোক, বাংলাদেশের পুরোনো ছবি হোক, পাকিস্তানি ছবি হোক, কিংবা ভারতীয় উত্তম–সুচিত্রার ছবি—প্রতিদিনই আমি মুভি দেখি। একমাত্র ব্যতিক্রম তখনই হয়, যখন বাসায় কোনো বিপদ-আপদ বা শোকের ঘটনা থাকে। না হলে প্রতিদিনই ছবি দেখেই ঘুমাই।

ছোটবেলায় আমি প্রায় প্রতিদিনই রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত হলে হলে ছবি দেখতাম। আমাদের এখানে তিনটা সিনেমা হল ছিল—মায়া, চৌধুরী আর নুপুর। এই তিনটা হলেই নিয়মিত ছবি দেখতাম। এমন অনেক ছবি আছে যেগুলো আমি বারবার দেখেছি। যেমন নয়নের আলো, অশান্তি, সন্ধি—এই ছবিগুলো বহুবার দেখেছি। নয়নের আলো আমি সর্বোচ্চ সাতবার দেখেছি, আর অশান্তি আট-নয়বার দেখেছি। ওই ছবিগুলোর গান যেমন সুন্দর ছিল, কাহিনিও তেমন শক্তিশালী ছিল।

বর্তমানে পেশাগত জীবনে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়। চাকরির কারণে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়, তাই এখন হলে গিয়ে ছবি দেখা সম্ভব হয় না, শুধু ছুটির দিন ছাড়া। তবে এখনো প্রতিদিন রাতেই কোনো না কোনো ছবি দেখে ঘুমাই।

বর্তমান যুগে হয়তো আমার মতো মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। কিন্তু ছবির প্রতি আমার ভালোবাসা সবসময় একই রকম। দেশ-কাল-স্থান ভেদে যেকোনো দেশের ছবি হোক না কেন, আমি ভালোবাসি। তারপরও বাংলাদেশের ৬০, ৭০ ও ৮০ দশকের সোনালি দিনের ছবিগুলো আমি এখনো ভুলতে পারি না।

আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, বাবা-মার সাথে প্রথম মায়া হলে যে ছবিটা দেখেছিলাম—সম্ভবত তখন আমার বয়স আট-নয় বছর—ছবিটার নাম ছিল পালঙ্ক। আর নিজে জ্ঞান হওয়ার পর প্রথম যে ছবি হলে দেখেছি, সেটা গাইবান্ধার নুপুর হলে—ছবির নাম ছিল লাভ ইন সিঙ্গাপুর, পরিচালনা করেছিলেন আজিজুর রহমান। সেখানে অভিনয় করেছিলেন ববিতা ও মোহাম্মদ কলি।

টিভিতে প্রথম যে ছবিটা দেখেছি, সেটা সম্ভবত মনের মানুষ—আলমগীর ও শাবানা অভিনীত। আমাদের বাসায় ১৯৭৫–৭৬ সাল থেকেই টিভি ছিল, তাই তখন থেকেই বাসায় বসে নিয়মিত ছবি দেখতাম।

আমার লেখাপড়ার ধরনটা একটু আলাদা ছিল। সত্যি বলতে, আমি সারাদিনই ছবি দেখতাম। গাইবান্ধার নুপুর, মায়া আর চৌধুরী—এই তিনটা হলে স্কুল পালিয়ে, কলেজ ফাঁকি দিয়েও ছবি দেখেছি। এজন্য বাসায় আমাকে অনেক বকা খেতে হয়েছে, অনেক সময় মারও খেয়েছি।

বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যে গানগুলো শুনি, সেগুলোর অনেকগুলোই রিমিক্স। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই গানগুলোর মূল উৎস কিন্তু পুরোনো সিনেমার গান। একসময় সিনেমা হলই ছিল গান ও বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। সিনেমা হলে বসে ছবি দেখার যে তৃপ্তি, সেটা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া যায় না।

কিন্তু যুগের প্রয়োজনে এখন আমাদের দেশে সিনেমা হল প্রায় নেই বললেই চলে। তাই আমরা ইউটিউব আর বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছবি দেখি। আগে ইউটিউব এত জনপ্রিয় ছিল না। চাকরির সুবাদে যখনই ঢাকায় ট্রেনিংয়ে যেতাম, বায়তুল মোকাররমের সিডি মার্কেট থেকে যতটা সম্ভব পুরোনো ছবি সংগ্রহ করতাম। রাজশাহী বা দেশের অন্য কোথাও গেলে আমার প্রথম কাজই ছিল পুরোনো সিনেমা খোঁজা। যত টাকা লাগুক, আমি সেগুলো সংগ্রহ করতাম।

আমার সংগ্রহে শুধু বাংলাদেশি নয়—পাকিস্তানি, ভারতীয় এমনকি কিছু ইংরেজি ছবিও আছে। যেগুলো আমার ভালো লেগেছে বা আমি দেখেছি, সেগুলো খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এখনো সেগুলো অক্ষত আছে। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন এই ছবিগুলোর সাথেই আমি আছি। এগুলো আমার স্মৃতি।

বাংলাদেশে নায়ক রাজ্জাককে বাদ দিয়ে কোনো ছবি কল্পনাই করা যায় না। উনি নিজেই যেন একটা প্রতিষ্ঠান। রাজ্জাক–শাবানা জুটি, তার আগে রাজ্জাক–কবরী জুটি—সবই অসাধারণ। এরপর আলমগীরের ছবি আমার খুব ভালো লাগত। শাবানা–আলমগীর মানেই তখন সুপারহিট। ববিতা–ফারুক, পরে রাজ্জাক–ববিতা, এরপর ববিতা–সরলা—সব জুটিই জনপ্রিয় ছিল।

জাফর ইকবাল আমার খুব পছন্দের একজন নায়ক। জনি ছিল সম্ভাবনাময়। জসিম, মাহমুদ কলি, রোজিনা, অঞ্জনা—সবার ছবিই আমি দেখেছি। ছোটবেলা থেকেই বাংলা ছবির সাথে আমার এই সম্পর্ক।

বাংলাদেশের পুরোনো ছবিগুলোতে যে কাহিনি, নায়ক-নায়িকা আর শিল্পমান ছিল—সেই সোনালি ঐতিহ্য আজ হারাতে বসেছি। তবুও আমার ব্যস্ত জীবনের মাঝেও আমি এই ছবিগুলো লালন করি, দেখি এবং অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিই। বর্তমান প্রজন্ম যেখানে অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে, সেখানে আমি আমাদের দেশের এই ঐতিহ্য ধারণ করার চেষ্টা করি।

বিশেষ করে ৭০, ৮০ ও ৯০ দশকের অনেক জনপ্রিয় ছবি আছে, যেগুলো আজকের প্রজন্ম চেনেই না। আমাদের হারানো সেই ঐতিহ্য থেকে কিছু ছবির নাম আমি সবার সাথে শেয়ার করতে চাই—
সদাগর, আবে হায়াত, মা, চোর, নিষ্পাপ, অপেক্ষা, স্বামী, বাবা কেন চাকর, নয়নমণি, সন্ধি, সন্ধান, নদের চাঁদ, আলিঙ্গন, নাগপূর্ণিমা, ঘরে বাইরে, ছুটির ঘণ্টা, স্বপ্নের ঠিকানা, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, অন্তরে অন্তরে, কে তুমি, প্রাণ সজনী, লাঠিয়াল, রংবাজ, গুন্ডা—এমন আরও অনেক ছবি।

আমি আশা করি, বর্তমান প্রজন্ম আমাদের দেশের পুরোনো ছবিগুলো দেখবে, শিল্পী ও পরিচালকদের সম্পর্কে জানবে, আমাদের চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র টিকে থাকুক—এইটাই আমার প্রত্যাশা।