২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে হাসিমুখে লাখপতি রাসেল

ব্যাবসা-বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: "চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে না ছুটে, সেই ঘুষের টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে চাকরির চেয়েও অনেক ভালো কিছু করে দেখানো সম্ভব।"—এই অদম্য জেদ আর কঠোর মনোবলকে পুঁজি করে আজ এক সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন রাসেল। মাত্র ২,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করা তার ব্যবসা আজ লাখ টাকার পরিধিতে রূপ নিয়েছে। দোকানে আগুন লাগা, তিন-তিনবার চুরি হওয়া কিংবা বাজারে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বাকি পড়ার পরও এক মুহূর্তের জন্য মনোবল হারাননি এই তরুণ ব্যবসায়ী। রাসেল আজ গাইবান্ধা অঞ্চলের তরুণদের জন্য এক অনন্য ও লিভিং ইন্সপিরেশন

যেভাবে শুরু: ২ হাজার টাকা থেকে লাখপতি

রাসেলের ব্যবসার শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালে, যখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। প্রথমে তার বড় ভাই ও ছোট ভাই মিলে একটি ছোট টিনের দোকান দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা সেটি ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে রাসেল পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেই সেই দোকানের হাল ধরেন। প্রথম অবস্থায় রাসেলের মা গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য হওয়ার সুবাদে সেখান থেকে মাত্র ২,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে কিছু চকলেট আর সিগারেট কিনে ব্যবসার যাত্রা শুরু করেন

ধীরে ধীরে রাসেল ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। গ্রামীণফোন থেকে সাধারণ কথা বলার সিম ও ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা শুরু করার পর ধাপে ধাপে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল ফাইন্যান্সিং সেবা যুক্ত করেন। এরপর কলেজের ফর্ম ফিলাপ, বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সুবিধা এবং চাল, ডাল, গ্যাস, কাঁচাবাজারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের মুদি মালামাল যুক্ত করে দোকানটিকে একটি পরিপূর্ণ মিনি-মার্কেটে রূপ দেন তিনি। এই ব্যবসার আয় থেকে আজ তিনি পাকা বাড়ি করেছেন, চাষাবাদের জমি কিনেছেন এবং গড়ে তুলেছেন গরু-ছাগলের খামার

ঝড়-বৃষ্টি আর ভাঙা টিনের ঘর: এক জাদুর প্রেরণা

শুরুর দিনগুলোতে রাসেলের দোকানটি ছিল ভাঙা টিনের ঘর। বর্ষাকালে রাতে যখন টিনের ফুটো দিয়ে হুড়হুড় করে পানি পড়ত, তখন রাসেল সেই পানি নিয়ে আক্ষেপ না করে আনন্দ পেতেন। তিনি বলেন: "টিনের দোকানে রাতে করে পানি পড়ত ঢের ঢের করে। পানিটাকে আমি বোল্টের (পাত্রের) মধ্যে ফেলে মজা পেতাম খুব। বৃষ্টি আমার প্রতি ভালোবাসা, কারণ এই বৃষ্টি থেকেই আমি ঘুরে দাঁড়ানো শিখছি। বৃষ্টি যখন পড়ে তখন জমি উর্বর হয়, আর বৃষ্টির পানি আমার দোকানে পড়ে আমার দোকানকেও উর্বর করেছে ইনশাআল্লাহ।"

৪০ লাখ টাকা বাকি ও চুরির ধাক্কা

ব্যবসায়িক জীবনে রাসেলের ওপর দিয়ে কম ঝড়ঝাপটা যায়নি। কাস্টমারদের কেনাকাটায় বাজারে বর্তমানে তার প্রায় ৪০ লাখ টাকারও বেশি বাকি পড়ে রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে ভুল নাম্বারে ক্যাশ-আউট বা টাকা চলে যাওয়ার কারণে ২৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে তার। এখানেই শেষ নয়, শত্রুতাবশত কে বা কারা তার দোকানের পেছনের ছোট গোডাউনে আগুন ধরিয়ে পুরো পুড়িয়ে দিয়েছিল এবং তার দোকানে দুই থেকে তিনবার বড় ধরনের চুরির ঘটনাও ঘটেছে

এত বড় আর্থিক ক্ষতির মুখেও রাসেল কখনো ভেঙে পড়েননি, বরং হাসিমুখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। রাসেলের ব্যবসার মূল থিম বা দর্শন হলো—কারো পেছনে না ছুটে নিজেকে এমনভাবে তৈরি করা যেন মানুষ তার পেছনে ছোটে। রাসেল বলেন: "যে টাকা বাকি পড়েছে বা ভুল নাম্বারে গেছে, তার পেছনে ছুটে আমি সময় নষ্ট করি না। আমার মূল লক্ষ্য ঘুরে দাঁড়ানো। যারা বাকি নেয় তাদের পেছনে ছোটার সময় আমার নাই। আমি সেই সময়ে নতুন কাস্টমার তৈরি করি এবং যাদের লেনদেন ভালো তাদের ভালো ফ্যাসিলিটি দেই।"

মায়ের প্রেরণা ও সাফল্যের মূলমন্ত্র

রাসেল তার এই সফলতার পেছনে মূল প্রেরণা হিসেবে তার মা, বড় ভাই রিয়াদ ভাই এবং তার মরহুম বাবার অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। তরুণদের উদ্দেশ্যে ব্যবসার জাদুকরী পরামর্শ দিয়ে রাসেল বলেন, ব্যবসা করতে গেলে জীবনের সব শখ-আহ্লাদ, বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা, বেড়াতে যাওয়া—সবকিছু বিসর্জন দিয়ে চরম ধৈর্যের সাথে ব্যবসায় মনোনিবেশ করতে হবেরাসেলের মতে, আল্লাহ সবসময় ধৈর্যশীলদের সহায় হন। কাস্টমারদের সাথে সৎ ইচ্ছা, অমায়িক ব্যবহার এবং পণ্যের গুণগত মান ঠিক রাখতে পারলে ব্যবসায়িক জীবনে হোঁচট খেলেও পুনরায় শূন্য থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব