চিকন সেমাইয়ের শত বছরের ঐতিহ্যের গল্প

ব্যাবসা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রমজানের ইফতার থেকে শুরু করে ঈদের সকাল—মিষ্টির আয়োজনে সেমাই ছাড়া যেন পূর্ণতা আসে না। আর এই সেমাইয়ের কথা উঠলেই অবধারিতভাবে চলে আসে উত্তরের জেলা বগুড়ার নাম। চিকন লাচ্ছা সেমাইয়ের জন্য দেশজুড়ে খ্যাত এই জেলায় সেমাই তৈরির পেছনে রয়েছে প্রায় শত বছরের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই ঐতিহ্যের বিবর্তন ও বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

কলকাতার সেই ঐতিহ্যবাহী লাচ্ছা সেমাইয়ের এই যাত্রার শুরু হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের কলকাতায়। এক সময় কলকাতার নাখোদা মসজিদ এলাকার লাচ্ছা সেমাইয়ের খ্যাতি ছিল জগতজোড়া। ঈদের আগে কলকাতা ও হুগলি থেকে ট্রেনযোগে সবুজ, হলুদ, গোলাপি, সাদা ও জাফরানি রঙের লাচ্ছা সেমাই বগুড়ায় আসত। ক্যালকাটা বেকারি ও হুগলি বেকারি এসব সেমাই বিক্রি করত। পরবর্তীতে কলকাতা থেকে কারিগর এনে বগুড়াতেই লাচ্ছা তৈরির কাজ শুরু হয়।

বগুড়ায় সেমাই শিল্পের প্রসার ৪০-এর দশকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা কয়েকজন দক্ষ কারিগর বগুড়ার চারমাথা ও গোদারপাড়া এলাকায় চিকন সেমাই তৈরি শুরু করেন। তাদের কাছ থেকেই কাজ শেখেন স্থানীয় বেজোড়া এলাকার কারিগররা। অল্প সময়ের মধ্যেই ‘বেজোড়া’ এলাকাটি ‘চিকন সেমাই পল্লী’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ৬০-এর দশকে বগুড়ার চিকন লাচ্ছার সুনাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ৮০-এর দশকে এই খাতে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে আকবরিয়া বেকারি এবং এশিয়া সুইটস।

কারিগরদের নিপুণ শিল্পকর্ম বগুড়ার প্রায় হাজারখানেক কারখানায় এখন দিন-রাত চলছে সেমাই তৈরির কর্মযজ্ঞ। মজার বিষয় হলো, চিকন সেমাই তৈরির অধিকাংশ কারিগরই নারী। কেউ ময়দার খামির তৈরি করছেন, কেউ বিদ্যুৎচালিত বা হাতে চালানো কলে খামির ঢালছেন, আবার কেউ রোদে শুকাচ্ছেন। এই সূক্ষ্ম কাজের জন্য প্রয়োজন প্রচুর ধৈর্য ও দক্ষতা। অতীতে শুধু পাম অয়েল বা সয়াবিন তেলে ভাজা হলেও, বর্তমানে ডালডা ও খাঁটি ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা স্বাদে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিশাল কর্মযজ্ঞ ও বাজারজাতকরণ ঈদকে কেন্দ্র করে রোজার দেড়-দুই মাস আগে থেকেই শুরু হয় ব্যস্ততা। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ট্রাক ভরে পৌঁছে যাচ্ছে বগুড়ার এই সুস্বাদু সেমাই। বর্তমানে শুধু ঈদ নয়, সারা বছরই এসব কারখানায় সেমাই তৈরি হয়।

বগুড়ার এই সেমাই শিল্প এখন শুধু একটি উৎসবের অংশ নয়, এটি হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা এবং এক বিশাল ঐতিহ্যের স্মারক। ঈদের আনন্দে যখন আমরা সেমাই মুখে তুলি, তখন তার পেছনে মিশে থাকে কয়েক প্রজন্মের কারিগরদের অক্লান্ত শ্রম আর শত বছরের ইতিহাস।