১৫০ টাকা সোনার ভরি থেকে শুরু
ব্যাবসা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
এক সময় সোনার ভরি ছিল মাত্র ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। কালের বিবর্তনে সেই দাম আজ আকাশচুম্বী। সোনার দাম বাড়ার সাথে সাথে বদলে গেছে গয়না তৈরির কারিগরি এবং ব্যবসার ধরণ। গাইবান্ধার এমনই এক তিন পুরুষের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ‘স্বর্ণ ভবন’, যা দীর্ঘ ৮০-৮৫ বছর ধরে সুনামের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে উঠে এসেছে এই স্বর্ণালঙ্কার শিল্পের বিবর্তন ও বর্তমান সংকটের কথা।
তিন পুরুষের ঐতিহ্য দোকানের বর্তমান স্বত্বাধিকারী জানান, তিনি গত ৩৫-৪০ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে জড়িত। তার আগে তার বাবা এবং তারও আগে তার ঠাকুরদা এই ব্যবসা পরিচালনা করতেন। জন্মগতভাবেই তিনি এই পেশার সাথে যুক্ত। ১৯৭১ সালের আগে সোনার দাম যখন অত্যন্ত কম ছিল, তখন থেকেই তাদের এই পথচলা শুরু।
সোনার ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতি আগে সোনা ঝালাই করার জন্য ‘পান’ ব্যবহার করা হতো, যাকে বলা হতো সনাতন পদ্ধতি। বর্তমানে আধুনিকায়নের ফলে সোনাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে— ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতি। সোনার সাথে তামার মিশ্রণ বা ‘খাদ’-এর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই এই ক্যারেট নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার দাম প্রতি ভরি প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার টাকার উপরে পৌঁছেছে।
কারিগরি বিবর্তন ও আধুনিক যন্ত্রাংশ এক সময় সোনার গয়না তৈরির সমস্ত কাজ হাতে করা হতো। সোনা গলানোর জন্য মুখে ফুঁ দিয়ে নলি ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন আধুনিক গ্যাস মেশিনের সাহায্যে সোনা গলানো হয়। এছাড়া তার তৈরির মেশিন, পাত মেশিন এবং পলিশ মেশিনের ব্যবহারে কাজের গতি ও ফিনিশিং আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। যে কাজ আগে ৫ দিনে হতো, তা এখন ৩ দিনেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
সততা ও নৈতিকতার গল্প ভিডিওতে ব্যবসায়ী একটি পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করেন। একবার এক মহিলা দোকানে দেড় ভরি ওজনের একটি সোনার চেইন ফেলে গিয়েছিলেন। তখন মোবাইল ফোন না থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল না। দুই দিন পর ওই মহিলা দোকানে ফিরে আসলে তিনি চেইনটি ফেরত দেন, যা গ্রাহকের মনে গভীর আস্থার সৃষ্টি করে। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে অনেক সময় ক্রেতা সেজে এসে অলঙ্কার চুরির মতো ঘটনাও ঘটে।
বর্তমান সংকট ও পেশা বদলের চিন্তা সোনার আকাশচুম্বী দাম এবং কাজের অভাবের কারণে বর্তমানে এই শিল্পটি সংকটের মুখে। ব্যবসায়ী জানান, কাজের বাজার এতটাই খারাপ যে অনেক কারিগর পেশা ছেড়ে দিয়ে এখন গাড়ি চালাচ্ছেন বা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তিন পুরুষের এই পৈত্রিক ব্যবসা ছেড়ে দেওয়া তাদের জন্য কষ্টের হলেও, টিকে থাকার তাগিদে নতুন কিছু যোগ করার কথা ভাবতে হচ্ছে তাদের।
বন্ধকী সুবিধা ও গ্রাহক সেবা অনেক সময় গ্রাহকরা তাৎক্ষণিক অভাব মেটাতে সোনা বিক্রি না করে বন্ধক রাখতে চান। কারণ বিক্রি করলে লস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে গ্রাহকের অনুরোধে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সোনা জমা রেখে টাকা ধার দেওয়ার ব্যবস্থাও কোনো কোনো দোকান করে থাকে, যাতে গ্রাহকের মূল্যবান সম্পদটি রক্ষা পায়।
গাইবান্ধার এই ‘স্বর্ণ ভবন’ শুধুমাত্র একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি জেলার স্বর্ণ শিল্পের ইতিহাসের সাক্ষী।



