পানের দোকানদার থেকে সফল মাইক ব্যবসায়ী

ব্যাবসা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে আসা এক কিশোরের জীবন আজ বদলে গেছে মাইকের জাদুকরী ব্যবসায়। গাইবান্ধার কামারজানিতে ঘরবাড়ি হারিয়ে যখন তিনি নিঃস্ব, তখন মার্কেটের সামনে পানের ডালা নিয়ে বসতেন। কিন্তু ইচ্ছা ছিল বড় কিছু করার। আজ তিনি গাইবান্ধার অন্যতম সফল মাইক ব্যবসায়ী, যিনি এক সময় এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মতো বড় বড় নেতাদের জনসভায় মাইক সরবরাহ করেছেন। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই সফল ব্যবসায়ীর জীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের কাহিনী উঠে এসেছে।

শুরুর সংগ্রাম ও সফলতার সিঁড়ি নদী ভাঙার পর যখন কোনো পথ ছিল না, তখন স্বপন চাচা নামে এক হিতৈষীর দোকানে পানের ডালা নিয়ে বসেন তিনি। তবে কর্মচারী হওয়ার বদলে লভ্যাংশ ভিত্তিক কাজের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি তিন-চারটি টিউশনি করে টাকা জমিয়ে এবং বাবার সহযোগিতায় প্রথম মাইকের সেট কেনেন মাত্র ১০-১২ হাজার টাকায়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এক-দুই মাসের মধ্যেই ৭-৮টি সেট এবং অল্প সময়ে প্রায় ২০-২৫টি সেটের মালিক হন তিনি।

ভিআইপি জনসভা ও এরশাদ সাহেবের আশীর্বাদ ১৯৯০ সাল থেকে মাইকের ব্যবসা শুরু করা এই ব্যবসায়ী গাইবান্ধা শহরের রাজপথ কভারেজ করতেন। সুন্দরগঞ্জে এরশাদ সাহেবের একটি প্রোগ্রামে মাইকের স্ট্যান্ড ঠিক করার সময় এরশাদ সাহেব নিজে তার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। এছাড়া খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার জনসভাতেও তিনি মাইক সরবরাহ করেছেন। এক সময় বিয়ে, আকিকা বা রাজনৈতিক সব অনুষ্ঠানেই তার মাইকের জয়জয়কার ছিল।

প্রযুক্তির বিবর্তন: ফিতা থেকে মেমোরি ব্যবসার শুরুর দিকে প্রযুক্তির অবস্থা ছিল অনেক কষ্টকর। তখন ক্যাসেট ফিতায় গান বা কথা রেকর্ড করতে হতো, যা প্রায়ই ছিঁড়ে যেত বা আটকে যেত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এখন কম্পিউটারের মাধ্যমে মেমোরি সিস্টেমে অনায়াসেই রেকর্ড করা সম্ভব হচ্ছে। এখনকার মেশিনগুলো অনেক উন্নত এবং ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের হওয়ায় ইনভেস্টও বেড়েছে কয়েক গুণ।

ব্যবসায় বর্তমান ধস ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, এক সময় মাইক ব্যবসায়ীদের অনেক সম্মান দেওয়া হতো, কিন্তু এখন মানুষ ‘মাইকওয়ালা’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। বর্তমানে পাড়া-মহল্লায় অনেক দোকান হওয়ায় ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। আগে ঘণ্টা হিসেবে ২০-২৫ টাকা আয় হলেও এখন সারাদিন মাইক চালিয়ে মাত্র ৩০০ টাকা পাওয়া যায়, যার মধ্যে রিকশা ভাড়াই দিতে হয় অনেকটা।

সন্তানদের শিক্ষা ও ব্যবসার ইতি এই সামান্য মাইক ব্যবসার আয় দিয়েই তিনি তার বড় ছেলেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করিয়েছেন, যিনি বর্তমানে একজন গবেষক হিসেবে কর্মরত এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তার ছেলেরা এই ব্যবসায় আসবে না বলে তিনি নিশ্চিত। তাই তার সাথেই হয়তো দীর্ঘ ৩০ বছরের এই ব্যবসার ইতি ঘটবে।

গাইবান্ধার এই লড়াকু মানুষের জীবন প্রমাণ করে যে, সততা আর পরিশ্রম থাকলে পানের দোকান থেকেও এক বিশাল ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব।