লাউয়ের খোলে ভেসে আসা পীর ও রাজার আত্মসমর্পণ

ঐতিহাসিক

নিজস্ব প্রতিবেদক :

কথিত আছে, কয়েকশ বছর আগে হযরত শাহবাঙ্গাল (রহ.) নামে এক পীর সাহেব লাউয়ের খোলে চড়ে নদীপথে ভেসে এসে বর্তমান গাইবান্ধা অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। তাঁর আগমনে শঙ্কিত হয়ে তৎকালীন হিন্দু রাজা তাঁকে বন্দি করতে সৈন্য পাঠান। কিন্তু অলৌকিকভাবে পীর সাহেবের কাছে আসা মাত্রই সৈন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে। অবশেষে রাজা নিজে এসেও অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পীর সাহেবের আধ্যাত্মিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই ঐতিহাসিক মাদ্রাসার উৎপত্তির রোমাঞ্চকর কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।

ঐতিহাসিক নাখারাজ ভূমি ও প্রতিষ্ঠানের জন্ম পীর সাহেবের আধ্যাত্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে রাজা তাকে বসবাসের জন্য অত্র এলাকাটি ‘নাখারাজ’ বা খাজনামুক্ত জমি হিসেবে লিখে দেন। জীবনের শেষ সময়ে শাহবাঙ্গাল (রহ.) স্থানীয় কিছু জিম্মাদারের কাছে এই জমিগুলো ওয়াকফ করে দিয়ে যান, যেন তা ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হয়। সেই থেকেই এখানে মসজিদ ও মাদ্রাসার উৎপত্তি। সময়ের আবর্তে ছোট সেই মসজিদ আজ বিশাল আকার ধারণ করেছে এবং পীর সাহেবের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘শাহবাঙ্গাল মাদ্রাসা’।

মাদ্রাসার বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে এই মাদ্রাসায় প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং ২০ জন শিক্ষকসহ মোট ২৫ জন স্টাফ কর্মরত আছেন। এটি একটি কওমি মাদ্রাসা যেখানে হিফজ বিভাগের পাশাপাশি কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রতি বছর এখান থেকে ২৫-৩৫ জন ছাত্র হিফজ সম্পন্ন করে পাগড়ি লাভ করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেক ছাত্র এখান থেকে পাশ করে দেশের বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে পাড়ি জমান।

অসহায় ও এতিম শিক্ষার্থীদের পাশে মাদ্রাসাটি মূলত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দান ও অনুদানে পরিচালিত হয়। এখানে চর অঞ্চলের দরিদ্র, এতিম ও অসহায় ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাদের মাসিক খরচে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয় এবং প্রতি রমজানে সংগৃহীত ‘যাকাত ফান্ড’ থেকে তাদের পড়াশোনার খরচ চালানো হয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অবকাঠামো মাদ্রাসার অবকাঠামোগত উন্নয়নে বর্তমানে রাস্তার পাশে একটি ছয়তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। নিচতলাটি ভবিষ্যতে মার্কেট হিসেবে ব্যবহার করে মাদ্রাসার জন্য আয়ের স্থায়ী উৎস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। এছাড়া এই নতুন ভবনে ‘দাওরা হাদিস’ (মাস্টার্স সমমান) পর্যন্ত জামাত খোলার চিন্তাভাবনা রয়েছে।

দীর্ঘদিনের খেদমত ও আবেদন মাদ্রাসার বর্তমান মুহতামিম জানান, তিনি ১৯৮৮ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত। ছাত্রজীবন শেষ করে শিক্ষকের অনুরোধে এখানে খেদমতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি এই মাদ্রাসার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে তিনি সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষের সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

গাইবান্ধার এই শাহবাঙ্গাল মাদ্রাসাটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের জীবন্ত প্রতীক।