মৌমাছির সাথে বন্ধুত্ব! মধু থেকে মাসে আয় লাখ টাকা
মধু
আমি মোহাম্মদ শিফতার আহমেদ খান। আজকে আমরা আপনাদের দেখাচ্ছি আমরা কীভাবে মধু হারভেস্টিং করি। মূলত আমরা বেসিক থেকে একটি ট্রেনিং নিয়েছিলাম। সেই ট্রেনিং শেষ করার পর কয়েকজন মিলে যৌথভাবে কিছু বক্স নিয়ে এই কাজ শুরু করি। আমরা সবসময় মধুর কোয়ালিটি নিশ্চিত করি।
আজ যে মধুগুলো আমরা হারভেস্ট করবো, আপনারা দেখবেন এগুলো সম্পূর্ণ ক্যাপিং করা। অর্থাৎ মৌমাছি যখন বুঝে যে মধু পরিপূর্ণ হয়ে গেছে, তখন তারা সেলগুলো সিল করে দেয়। এখানে যে সাদা অংশটা দেখা যাচ্ছে, সেটাই ক্যাপিং করা মধু। মানে মধু পুরোপুরি পরিপক্ক হয়ে গেছে।
এটা হচ্ছে রানী মৌমাছি। রানী মৌমাছির কাজ হলো পুরো বি-সেলের ভেতরে ঘুরে ঘুরে ডিম পাড়া। একটি রানী মৌমাছি দিনে গড়ে ১৫০০ থেকে ২০০০টি ডিম পাড়ে। এই কলোনির সব কর্মী মৌমাছি ও পুরুষ মৌমাছি রানীর নির্দেশ মেনে চলে। যদি কখনো রানী অনুপস্থিত থাকে, তাহলে পুরো কলোনি বিশৃঙ্খল হয়ে যায়।
শুরুতে আমাদের মৌমাছিকে খুব ভয় লাগতো। ট্রেনিংয়ের সময় অনেক ভয় পেতাম। কিন্তু আসলে এটা ভয় পাওয়ার মতো কিছু না। মৌমাছি যখন আপনাকে চিনে ফেলে এবং আপনি তাদের বন্ধু হয়ে যান, তখন তারা কামড়ায় না। তবে মাঝে মাঝে বন্ধুত্বেও একটু ঝগড়া হয়, তখন দুই-একটা মৌমাছি আদর করে কামড় দেয়।
এখানে আপনারা বিস্তীর্ণ সরিষার ক্ষেত দেখতে পাচ্ছেন। এই সিজনে তীব্র শীতের কারণে মধু হারভেস্টিং খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। আগে বড় পরিসরে মধু সংগ্রহ করা যেত, কিন্তু এবার সরিষা ক্ষেতের অবস্থা খুব একটা ভালো না। শীতকালে মৌমাছি সাধারণত ঘর থেকে বের হয় না। ফলে বি-সেলে জমে থাকা মধু তারাই খেয়ে ফেলে।
অনেকেই ক্রিস্টাল হানি সম্পর্কে শুনেছেন। সরিষা ফুলের মধুই মূলত ক্রিস্টাল হানি নামে পরিচিত। আগে আমরা ভাবতাম মধু জমাট বাঁধলে সেটা ভেজাল, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব মধু হারভেস্ট করা হয়, সেগুলো সাধারণত ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত জমাট বাঁধে। আর ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যেসব মধু সংগ্রহ করা হয়, সেগুলো সাধারণত জমাট বাঁধে না।
যেমন লিচু ফুলের মধু কখনোই জমাট বাঁধে না। সুন্দরবনের কলসা ফুল বা বাইন ফুলের মধুও জমাট বাঁধে না। এসব মধুতে পানির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
একটি মৌমাছি প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি ফুল থেকে এক ফোঁটা মধু সংগ্রহ করে। সেই এক ফোঁটা মধুর মধ্যে শুরুতে প্রায় ৭০% পানি আর ৩০% কাঁচা মধু থাকে। এই মধু পরিপূর্ণ হতে ১৫ থেকে ২০ দিন বা তারও বেশি সময় লাগে। যদি খামারি এই সময়টা মৌমাছিকে দেয়, তাহলে সেই মধুকেই আমরা সম্পূর্ণ পরিপক্ক মধু বলি।
এটা হচ্ছে এপিস মেলিফেরা প্রজাতির মৌমাছি। এটি মধু উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শীর্ষ প্রজাতির একটি। মোট চার ধরনের মৌমাছি রয়েছে—এপিস মেলিফেরা, এপিস সেরেনা, এপিস ডরসাটা ও ফ্লোরিয়া। এপিস মেলিফেরা খুব শান্ত স্বভাবের এবং খুব বেশি মধু উৎপাদন করে।
সাধারণভাবে একটি বক্সে মাসে প্রায় ২ কেজি মধু উৎপাদন হয়। তবে ফুল, আবহাওয়া ও সময়ভেদে ৭–৮ কেজি এমনকি কখনো ১০ কেজি পর্যন্ত মধু হারভেস্ট করা সম্ভব।
মধু মানেই একটি বিশুদ্ধ পানীয়। সূরা নাহলে আল্লাহ তাআলা মৌমাছির জীবনচক্র সম্পর্কে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। মধুর গুণগত মান নির্ভর করে ক্যাপিংয়ের উপর। মৌমাছি যত ভালোভাবে ক্যাপিং করে, মধুর মান তত ভালো হয়।
প্রতিটি বক্সে প্রায় ১০ হাজার টাকার মৌমাছি থাকে, কারণ মৌমাছি কিনতে হয়। অফ সিজনে মৌমাছির খাবারের জন্য প্রচুর চিনি লাগে। এছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মৌমাছির বক্স স্থানান্তরের খরচও থাকে। তাবুতে থাকা, খাওয়া-দাওয়ার খরচ—সব মিলিয়ে এটিই মূল খরচ।
তবুও দুই-চার মণ মধু হারভেস্ট হলেও মাসে প্রায় এক লাখ টাকার কাছাকাছি মধু বিক্রি হয়। আমরা সারা বাংলাদেশেই মধু সরবরাহ করি। যারা আমাদের কাছ থেকে মধু নেন, তাদেরকে আমরা লাইফ গ্যারান্টি দেই।
মধু কখনো নষ্ট হয় না, যদি ফুড গ্রেড কাচের জারে সংরক্ষণ করা হয়। কাচের জারে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় না, তাই মধু নিরাপদ থাকে।
আমরা বহুবার মৌমাছির কামড় খেয়েছি। একবার তো এমনও হয়েছে, মধু হারভেস্ট করার সময় কানে কামড় দিয়েছিল। তবুও সরাসরি মধু আহরণ করে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার আনন্দটাই আলাদা।
আমরা ভোক্তাদের কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ভবিষ্যতে ইচ্ছা আছে আরও অনেক বক্স করার, সেখান থেকে সরাসরি নিরাপদ মধু ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।
গোবিন্দগঞ্জ, বগুড়া, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আমাদের আউটলেটে আসে। আমাদের আউটলেটের ঠিকানা মালিপাড়া, গাইবান্ধা সদর, জিএস কোচিং রোড। এছাড়া সরাসরি ফোনেও যোগাযোগ করা যায়: 01717874347।



