গরুর মাংসের আচার! স্ত্রী ঘুরালো বেকার স্বামীর ভাগ্য!

আচার

গরুর মাংসের আচারটা আজ ৬৪টা জেলা পার হয়ে ১৭টা দেশে যাচ্ছে। অথচ এমন একটা সময় ছিল, আমার ছোট বাচ্চার দুধ কেনার টাকাটাও আমাদের কাছে ছিল না। কারো কাছ থেকে আমরা একটা টাকাও হেল্প পাইনি।

তখন আমার মেয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। সে তার মাটির ব্যাংক এনে আমাকে দেয়। ব্যাংকটা ভেঙে দেখি ভেতরে ৩৬৫ টাকা আছে। ওই টাকা থেকে মেয়ের হাতে ৬৫ টাকা দিয়ে আমি ৩০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলাম। ওই ৩০০ টাকা দিয়ে আলু কিনে আনলাম। তখন পাঁচ কেজি আচার বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পাঠালাম।

করোনার সময় আমার স্বামীর চাকরি হঠাৎ করে চলে যায়। সে বগুড়ার হোটেল নাচ গার্ডেনে অ্যাকাউন্টসে কাজ করত। আমরা বুঝতেই পারিনি করোনা এমন ভয়ংকরভাবে আসবে। তখন এমন পরিস্থিতি হয় যে, বাচ্চার দুধ কেনার টাকাও ছিল না। আমার স্বামী চাকরির জন্য অনেক জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করেছে, জুতাও ক্ষয় হয়ে গেছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিল।

আমি তখন বললাম, চলো আমরা একটা ব্যবসা শুরু করি। সে বলল, টাকা ছাড়া ব্যবসা কীভাবে করব? আত্মীয়স্বজনের কাছে টাকা ধার চাইলাম, কেউ একটা টাকাও দিল না। তখন আমার মেয়েই তার মাটির ব্যাংক এনে দিল। সেই কষ্টটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

৩০০ টাকা দিয়ে আলু কিনে আলুর চিপস বানালাম। ফেসবুকে ছবি দিলাম, কিন্তু সাড়া পেলাম না। পরে কয়েকটা গ্রুপে পোস্ট করলাম। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রথম অর্ডার আসে—দুই কেজি আলু চিপস। ৬০০ টাকা বিক্রি করলাম। বুঝলাম, এভাবে বড় কিছু করা যাবে না।

এরপর আমার মা আমাকে ২০ হাজার টাকা পাঠাল। সেই টাকা দিয়ে শাড়ি এনে ফেসবুকে পোস্ট করলাম। আমার দেবর একটা ফেসবুক পেজ খুলে দিল। তখন ভাবলাম, আমাকে এমন কিছু করতে হবে যা অন্য কেউ করছে না।

শাশুড়ির মুখে শুনেছিলাম, আগে কুরবানির সময় মানুষ মাংস রোদে শুকিয়ে বা জাল করে সংরক্ষণ করত। সেই ভাবনা থেকেই আমি গরুর মাংস দিয়ে আচার বানানোর চেষ্টা করি। নিজের মতো করে মসলা যোগ করে ছবি তুলে পোস্ট দিলাম। পোস্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ কেজির অর্ডার আসে।

এক পা এক পা করে অর্ডার বাড়তে থাকে—বগুড়া, ঢাকা, বিভিন্ন জেলা থেকে। এরপর প্রথম আলোতে আমার গল্প ছাপা হয়—“করোনা অকাল কাটছে গরুর মাংসের আচার।” নিউজ হওয়ার পরের দিনই প্রায় ১০০ কেজি আচারের অর্ডার আসে।

এরপর লন্ডন থেকে একজন এক্সপোর্টার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি ১০০ কেজি আচার নেন এবং বিদেশে এক্সপোর্ট করেন। এভাবেই দেশ ও দেশের বাইরে আমার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে আমাকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। তারা আমাকে বিনা জামানতে ৫ লাখ টাকা লোন দেয়। সেই লোন দিয়ে আমি ধীরে ধীরে ব্যবসা গুছিয়ে নেই।

এখন আমাদের গরুর মাংসের আচার নিয়মিত ১৭টা দেশে যাচ্ছে। পাশাপাশি আমরা ঘি প্রোডাকশন করছি, যা জাপানে এক্সপোর্ট হচ্ছে। সরকারি জয়িতা সম্মাননা পেয়েছি, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও গাকের সহযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছি।

আমরা বগুড়া মিট প্রসেসিং থেকে মাংস সংগ্রহ করি। গরু জবাইয়ের আগে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মাংস প্রসেস করে আচার তৈরি করা হয়। সিদ্ধ করে, তেলে ভেজে পানি শুকিয়ে একদম হাড়-চর্বি ছাড়া ফ্রেশ মাংস দিয়ে আচার বানানো হয়।

এই আচার ৪–৫ মাস ভালো থাকে। ফ্রিজে রাখা লাগে না, গরম করাও লাগে না। মেডিকেল স্টুডেন্ট, ভার্সিটির ছাত্র, ব্যাচেলর, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার—অনেকে ৬০–৭০ কেজি করে নেয়। ভাত, খিচুড়ি, মুড়ির সঙ্গে খাওয়া যায়।

আমি আমার আচারে কোনো প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করি না। রসুন, খাঁটি ঘানি ভাঙা সরিষার তেল ব্যবহার করি। কোনো কেমিক্যাল নেই। বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাই নিশ্চিন্তে খেতে পারে।

শুরুর দিকে বিএসটিআই এসে প্রোডাকশন বন্ধ করতে বলেছিল। আমি তাদের বলেছিলাম—আমার বাচ্চার দুধ ছিল না, তখন কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। এখন আমি এত কষ্ট করে এখানে এসেছি, ব্যবসা বন্ধ করতে পারব না। শেষ পর্যন্ত তারা সময় দেয়।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের লোন নিয়ে আমি সব লাইসেন্স, বিএসটিআই, পরিবেশগত ছাড়পত্র সম্পন্ন করি।

এখন প্রতি মাসে ২০০–৩০০ কেজি আচার বিক্রি হয়, এক্সপোর্টের মাসে ৫০০–৬০০ কেজি। নতুন উদ্যোক্তাদের আমি বলব—নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, সৎ থাকতে হবে। অসৎ পথে কেউ কখনো বড় হতে পারে না।

আমি ধৈর্যের কারণে এতদূর আসতে পেরেছি। ছোট বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে রাত জেগে আচার বানিয়েছি। এখনো করি।

গাকের সহযোগিতায় আমরা মিনি প্যাকেট চালু করেছি—৭৫ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার সুপারশপে আমাদের মাংসের আচারের মিনি প্যাকেট পাওয়া যাচ্ছে।