বিনা টাকায় প্রশিক্ষণ দিয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করছেন গাইবান্ধার মাহবুবা
উদ্যোক্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
অসহায় ও দুস্থ নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাইবান্ধার নারী উদ্যোক্তা মাহবুবা। নিজের মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যেখান থেকে গত কয়েক বছরে শতাধিক নারী ব্লক-বাটিক ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে উঠে এসেছে তার এই মহতী উদ্যোগের গল্প।
শূন্য থেকে শুরু ও বর্তমান অবস্থান মাহবুবা জানান, ১৯৯৬-৯৭ সালে কলেজ জীবনেই তিনি এসব কাজ শিখতেন। দীর্ঘ বিরতির পর মাত্র ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি পুনরায় তার ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে তার মাসিক আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। গাইবান্ধার পুরাতন ডিসি অফিস সংলগ্ন ‘আনিফ্যাস ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড’ (Anifash Fashion World) নামে তার একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান মাহবুবার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দুস্থ নারীদের স্বাবলম্বী করা। তিনি জানান, যারা একেবারে অসহায়, তাদের তিনি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ব্লকের প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে অনেকে নিজেরা বুটিক শপ দিয়েছেন, আবার অনেকে তার কারখানাতেই কাজ করছেন। এমনকি তার কাছে কাজ শিখে এক নারী উদ্যোক্তা বর্তমানে নিজের বড় বুটিক্স হাউস পরিচালনা করছেন। যারা সরাসরি ব্যবসা করতে পারেন না, মাহবুবা তাদের সেলাই ও ব্লকের কাজ দিয়ে আর্থিক সহায়তা করেন।
ব্লক ও হ্যান্ডপেইন্টের নিপুণ কাজ তার কারখানায় কাঠের ডাইসের মাধ্যমে ব্লকের কাজ এবং তুলি দিয়ে হ্যান্ডপেইন্টের কাজ করা হয়। মাহবুবা সবসময় হাই কোয়ালিটির কাপড় ব্যবহার করেন এবং রঙের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। নিজেরা নকশা তৈরি করার পাশাপাশি প্রচলিত বিভিন্ন নকশাতেও তারা কাপড় রাঙিয়ে তোলেন। তার তৈরি ব্লকের থ্রিপিস ৭০০ টাকা থেকে শুরু হয় এবং হ্যান্ড স্টিচের কাজ ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মূল্যের হয়ে থাকে।
বাজারজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল মাহবুবার তৈরি পোশাকের চাহিদা এখন শুধু গাইবান্ধায় সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকার কয়েকটি বড় শোরুমের পাশাপাশি বিদেশেও তার পণ্য যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকার একজন বায়ার নিয়মিত তার কাছ থেকে পোশাক সংগ্রহ করেন। এছাড়া ফতুয়া, কুর্তি ও শাড়ি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক বাধা একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে মাহবুবার পথচলা খুব সহজ ছিল না। শুরুতে পরিবার ও সমাজ থেকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসা করার বিষয়টি অনেকে সহজভাবে নিতে পারেনি। এছাড়া গাইবান্ধায় কাঁচামাল না পাওয়ায় তাকে ঢাকা বা বগুড়ার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা তার ব্যবসার অন্যতম প্রধান বাধা।
যোগাযোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মাহবুবা চান আমৃত্যু এই কাজের মাধ্যমে নারীদের পাশে থাকতে। নতুন যারা ঘরে বসে স্বাবলম্বী হতে চান, তাদের তিনি প্রশিক্ষণ ও কাঁচামাল দিয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত। আগ্রহী নারীরা গাইবান্ধার পুরাতন বিডিস একোস্টেট পাড়ায় অবস্থিত তার প্রতিষ্ঠান ‘আনিফ্যাস ফ্যাশন ওয়ার্ল্ড’-এ যোগাযোগ করতে পারেন।
মাহবুবা বিশ্বাস করেন, পরিবার থেকে সমর্থন পেলে এবং নারীরা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একদিন অবশ্যই পরিবর্তিত হবে।



