‘সেনাবাহিনীর সাহায্য ছাড়া হয়তো আজ আমি বেঁচে থাকতাম না’

সেনাবাহিনী

মনে হয় এক সপ্তাহের মতো খাবার ছিল। সেই খাবারটা আমি তিন মাস ধরে অল্প অল্প করে খেয়েছি, কোনোমতে বেঁচে ছিলাম। পরে পানি শেষ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়, নেটওয়ার্কও বন্ধ। তখন চিন্তা করছিলাম—আমার খাবারও শেষ, কিছুই নেই, আমি এখানে কীভাবে বাঁচবো?

আমি ২০০৪ সালে কাজের উদ্দেশ্যে সুদানে গিয়েছিলাম। আল্লাহ আমাকে সেখানে ভালো একটা অবস্থান দিয়েছিলেন। কাজ করেছি, ভালো রোজগার ছিল, গাড়ি-বাড়ি করেছি। এভাবেই কাজ করতে করতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলাম। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সেখানে যুদ্ধ শুরু হয়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন সকালে আমি কাজে বের হয়েছিলাম। সকাল দশটার দিকে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। ভয়ংকর শব্দ হয়। তিন–চার মিনিট পর বিমান থেকে হামলা শুরু হয়। তারপর চারদিক অচল হয়ে যায়। আমি আর কোথাও বের হতে পারিনি। প্রায় আড়াই মাস আমি ওই জায়গায় বন্দি অবস্থায় ছিলাম।

চারদিকে সারাক্ষণ গোলাগুলি চলতো—২৪ ঘণ্টা। মানুষজন এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আমি যে বিল্ডিংয়ে ছিলাম, সেখানে একাই ছিলাম। নিচে দোকান ছিল, সব লুট হয়ে গেছে। একদিন নিচে নেমে কিছু খাবার পাই। সেই খাবারই এক সপ্তাহের ছিল, যেটা আমি তিন মাসে খেয়েছি।

পানি শেষ হয়ে গেলে বিদ্যুৎও বন্ধ হয়ে যায়। নেটওয়ার্ক ছিল না। তখন ভাবলাম, সন্ধ্যার সময় বাইরে বের হবো। সন্ধ্যায় বের হয়ে আধা কিলোমিটারও যাইনি—রাস্তায় একটা চেকপোস্টে সেনাবাহিনী আমাকে আটকায়। তারা বলে, আমি নাকি সন্ত্রাসী সংগঠনের স্নাইপার।

আমি বলি, “ভাই, আমি বাংলাদেশি, কাজের জন্য এখানে ছিলাম, আমি কোনো স্নাইপার না।” আমার মোবাইল চালু করে সব ডকুমেন্ট দেখাই। তারপরও তারা আমাকে ছাড়েনি। বন্দি করে নিয়ে যায়।

প্রায় আট মাস আমি বন্দিশালায় ছিলাম। খাবার খুব কম দিতো—দুই দিনে একবার, দুই লোকমা। গোসলের সুযোগ ছিল না। মারধর করতো। শরীর একদম ভেঙে গিয়েছিল, শুধু হাড় আর চামড়া ছিল।

একদিন হঠাৎ ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়। সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। সেনাবাহিনী বন্দিশালা খুলে দেয়। সবাই পালাতে শুরু করে। আমি হাঁটতেই পারছিলাম না। দুই মিনিট হাঁটলে এক মিনিট বসে থাকতে হতো।

জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে চলতে থাকি। নিজের বাসা অনেক দূরে ছিল। দেড় কিলোমিটার যেতে আমার দুই দিন লেগে যায়। বাসায় গিয়ে দেখি সব পুড়িয়ে ফেলেছে। রান্নাঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। শুধু আমার ঘরটা খোলা যায়নি। সেখানে রাখা কাপড়-চোপড় ছিল।

আমার কিছু টাকা মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলাম। ওরা সেটা পায়নি। কয়েক মাস আগের শক্ত হয়ে যাওয়া রুটি ছিল। পানিতে ভিজিয়ে সেই রুটি চার-পাঁচ দিন খেয়ে কোনোমতে একটু শক্তি পাই।

এরপর ব্যাগে কিছু কাপড় ভরে বের হই। আবার রাস্তায় ধরা পড়ি। সন্ত্রাসীরা আমাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে আমার পুরনো লেবাররা আমাকে চিনে ফেলে। তারা আমাকে তাদের বাসায় নিয়ে যায়।

আমি নিজের রুমে গিয়ে দেখি, আমার কিছু জিনিস ঠিক আছে—কম্পিউটার, মোবাইল, কিছু টাকা। সেগুলো নিয়ে গাড়িতে তুলি। ২৬ তারিখ রাতে আমরা রওনা হই। পথে ড্রোন দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, পাশের গাড়িতে আগুন ধরে যায়।

আমি হাঁটতে পারি না, দৌড়ানো তো দূরের কথা। রোজা ছিল। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চার–পাঁচ দিন ছিলাম। পরে একা একা হেঁটে প্রায় ১৭ দিন চলি।

শেষ পর্যন্ত সুদান ও সাউথ সুদানের সীমান্তে পৌঁছাই। সেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাকে উদ্ধার করে। তারা আমাকে গোসল করায়, খাবার দেয়, টাকা দেয়। আমার অবস্থা দেখে তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর মিজান আর ক্যাপ্টেন আশফাক আমার জন্য অনেক কিছু করেন। তারা কাগজপত্র, টিকিট সব ব্যবস্থা করে দেন। বিমানবন্দরে নিয়ে যান। ইথিওপিয়া হয়ে আমি ঢাকায় ফিরি।

ঢাকায় এসে সেনাবাহিনী আমাকে রিসিভ করে। পরে আমি বাড়িতে আসি। আমার নাম মোহাম্মদ মনুল হক। আমি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার তালুকবাজিদ গ্রামের মানুষ।

আমি বিয়ে করেছিলাম ২০০৮ সালের শেষের দিকে। আমার দুইটা সন্তান—একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ছেলে ক্লাস টেনে, মেয়ে ক্লাস সেভেনে পড়ে। দুই বছরের বেশি সময় আমি তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। মোবাইল ছিল না, নেটওয়ার্ক ছিল না।

আমার ছেলে বলেছিল, “বাবা, আমি প্রতিদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি।” এই কথাটা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে।

এখনো মাঝে মাঝে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। জানি না ওরা কেমন আছে। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি—আমার সন্তানরা যেন ভালো থাকে।