সুতায় তৈরি ভালোবাসার কলম!

আমি কলমের উপর যেকোনো ধরনের ডিজাইন করতে পারি। যেমন—লেখা দিতে পারি: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আই লাভ ইউ, আই মিস ইউ, আই হেট ইউ ইত্যাদি। ফোন নম্বরও লেখা যায়। আবার কলমে লাভ চিহ্ন, প্রজাপতি—এরকম বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন আমি সুতা দিয়ে করি। এই কাজটা আমি পুরোপুরি নিজে নিজেই শিখেছি এবং নিজেই তৈরি করি।

একদিন আমি একটা কলম দেখছিলাম। ওই কলমটা আমি এক ভাইয়ার কাছ থেকে চাইছিলাম, কিন্তু উনি আমাকে কলমটা দেননি। তখন আমি বলেছিলাম, “ভাইয়া, আমাকে একটা কলম বানিয়ে দেন, টাকা লাগলে দেব, বা আমাকে একটু শেখান।” উনি আমাকে বলেছিলেন, “এটা তুমি শিখতে পারবা না।”

ওই কথাটা শোনার পর থেকেই আমার ভেতরে একটা জেদ কাজ করে। তখন আমি ভাবলাম, এমন কী আছে যে আমি শিখতে পারব না? সেই শখ আর জেদের কারণেই আমি এটা করা শুরু করি। পরে ওই ভাইয়া আমাকে একটা নষ্ট, ফেলে দেওয়ার মতো কলম দিয়েছিল। আমি সেই কলমটা খুলে দেখি, আবার লাগাই, ঘুরাই, দেখি—কয়টা সুতা, কোন দিকে যায়, কীভাবে প্যাঁচ দেওয়া হয়।

এইভাবে কাজ করতে করতে আমার প্রথম একটা কলম বানাতে প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। অনেক ভুল হয়েছে। একটা কলম খুলেছি, আবার প্যাঁচ দিয়েছি, আবার খুলেছি, আবার লাগিয়েছি। এভাবে করতে করতেই এক সময় দেখা গেল কলমগুলো আগের চেয়ে সুন্দর হচ্ছে। আগে খুব ভালো হতো না, এখন মোটামুটি ভালো এবং সুন্দর হয়।

এই কলমগুলো আমি প্রতি পিস ২০০ টাকা করে বিক্রি করি। যারা শখের জিনিস পছন্দ করে বা কাউকে গিফট দিতে চায়, মূলত তারাই এই কলমগুলো নেয়।

শুরুর দিকে অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। যখন প্রথম কাজ শুরু করি, তখন সবাই বলত, “এইটা তুই কী করিস?” আমি বাইরে বসে কাজ করতাম, তখন লোকজন প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করত—“এখনো কেন শেষ হয় না? এতদিন ধরে কী বানাচ্ছিস?” কিন্তু কাজ করতে করতে প্রায় তিন মাস পরে আমি পুরোটা শিখে যাই।

এরপর অনেক কলম বানাতে শুরু করি, বিক্রিও বাড়তে থাকে। একজন এসে বলেছিল, “কলমটা তো অনেক সুন্দর, এটা কীভাবে বানাও?” আমি বললাম, “এভাবে বানাই।” সে বলল, “আমাকে একটা বানিয়ে দেবে?” আমি প্রথমে কলমটা বিক্রি করতে চাইনি। পরে সে বলল, “আমি ঢাকায় চলে যাব, সময় হবে না। এই কলমটাই আমাকে দাও, তুমি পরে আরেকটা বানিয়ে নিও।” তখন সে ২০০ টাকা দিয়ে কলমটা নিয়ে যায়। সেখান থেকেই মূলত দামটা ২০০ টাকা নির্ধারণ হয়ে যায়।

এখন ২০০ টাকাতেই সবাই নেয়। যদি শুধু নাম লিখি, তাহলে একটা কলম বানাতে ৩–৪ ঘণ্টা লাগে। আর যদি ১১ ডিজিটের ফোন নাম্বার লিখি, তাহলে প্রায় ২ ঘণ্টায় শেষ হয়। আমি এই কাজটা শুরু করেছিলাম এসএসসি পরীক্ষার পর। তাই পরিবার থেকেও খুব বেশি বাধা আসেনি।

আগে আমি ভাবতাম, একটা ওয়ার্ড লিখলে হয়তো ১০০ টাকা নেওয়া উচিত। এখন নামের পাশাপাশি নাম্বারও লিখি। এছাড়া প্রজাপতি, লাভ চিহ্নসহ বিভিন্ন ডিজাইন করি।

এই কাজটা করতে আমি মোট ২৪টা সুতা ব্যবহার করি। তার মধ্যে ৪টা করে সুতা তুলে ডিজাইন বানাই। ৪টা সুতা উপরে তুলে রাখলেই একটা ডিজাইন তৈরি হয়। এরপর যদি ২ বা ৩টা প্যাঁচ দেওয়া হয়, তার উপর আবার একটা প্যাচ দিলে খুব সুন্দর একটা লাইন আসে।

বর্তমানে আমি একটা দোকান চালাচ্ছি এবং এই কাজটাই নিয়মিত করছি। যারা অর্ডার দেয়, তাদের আমি অনলাইন এবং অফলাইন—দু’ভাবেই কলম সরবরাহ করি। এখন কুরিয়ারের মাধ্যমেও পাঠাই। কেউ অন্য জায়গা থেকে চাইলে কুরিয়ারে পাঠানো সম্ভব।

যেসব কলমে রাবার থাকে, সেগুলোতে ডিজাইন করা অনেক সুবিধাজনক। রাবারের ভেতরে সুতা ঢুকিয়ে রাবারটা উপরে দিলে ডিজাইন শক্ত হয়ে যায়, টানলেও খুলে আসে না। এখন এই ধরনের কলমের চাহিদাই বেশি। নির্দিষ্ট কিছু কালারের কম্বিনেশন খুব সুন্দর লাগে, যেমন মাঝখানে সাদা রঙ দিলে আরও ভালো দেখায়।

এখন আমি নিজে বানাই, আমার সাথে আরেকজনও বানায়। আরও অনেকে শিখতে চায়—আমি বলেছি, কোনো সমস্যা নেই, আমি শিখাবো। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো—যদি অর্ডার আসে, বানাতে থাকব। কেউ শিখতে চাইলে শেখাবো। যদি সুযোগ হয়, তাহলে বিদেশেও পাঠানোর চিন্তা আছে।

একটা এনজিও থেকেও আমাকে বলেছিল ১০টা কলম দিতে। তারা অর্ডার দিয়েছিল। বলেছে, যদি বাইরে পাঠানো যায়, তাহলে আমাকে জানাবে। কেউ অর্ডার দিতে চাইলে আমার ফোন নম্বরে কল করতে পারে বা আমার ফেসবুক পেজে নক দিতে পারে।

ডেলিভারির সময়টা কাজের চাপের উপর নির্ভর করে। কাজ কম থাকলে দ্রুত দেওয়া যায়। সবকিছু কথার মাধ্যমেই জানিয়ে দিই—কয়দিন সময় লাগবে, কোন দিনে দেওয়া যাবে।