ছোট্ট গ্যারেজে বড় স্বপ্ন: রায়হানের জীবন সংগ্রাম
আমাদের কাজ হলো মোটরসাইকেল সারানো। মোটরসাইকেলের যেকোনো সমস্যা আমরা সমাধান করার চেষ্টা করি। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—যে কাজগুলো অনেক জায়গায় হয় না, সেই কাজগুলো আমার এখানে হয়। এই কারণেই অনেকে আমাকে খুঁজে, অনেকে আমাকে ভালোবাসে, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী এখানে আসে। আমি চেষ্টা করি সবাইকে ভালোভাবে সার্ভিস দেওয়ার।
আমার এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম রিমঝিম অটো রিপেয়ারিং হাউস। এই দোকানে আমি দীর্ঘ সাড়ে আট বছর ধরে বসছি। মোটামুটি গাইবান্ধা জেলার সবাই আমাকে চেনে। আমার অভিজ্ঞতা প্রায় ২৪–২৫ বছরের। এই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বিশ্বাস করি—যে ভালো মেকার হবে, ভালো কাজ করবে, আল্লাহ পাকের রহমতে তার ব্যবসা ভালো চলবে। আর যদি কেউ ফাঁকি দেয়, তার ব্যবসা টিকবে না।
এই প্রায় ২৬ বছরের মধ্যে ১৫ বছর আমি আমার ওস্তাদের গ্যারেজে কাজ করেছি। আমি ১৯৯৯ সালে সেখানে ঢুকি। তখন আমার বেতন ছিল মাত্র পাঁচ টাকা। সেই সময় পাঁচ টাকার অনেক মূল্য ছিল। যেমন হায়াত মুন্সির দোকানে পাঁচ টাকায় আমাদের দুপুরের খাবার হয়ে যেত।
যখন আমি মোটামুটি কাজ শিখে ফেলি, তখন আমার ওস্তাদ আমাকে চেইন অ্যাডজাস্ট করতে দেন। একদিন চেইন অ্যাডজাস্ট করতে গিয়ে মোবিল দেওয়ার সময় চাকার চেইনের মধ্যে নখ ঢুকিয়ে চাকাটা ঘোরাতে গিয়ে আমার বাম হাতের নখের মধ্যে ক্র্যাঙ্কের দাঁত ঢুকে যায়। ঘটনাটা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। এছাড়া অসংখ্যবার সাইলেন্সার পাইপে হাত পুড়েছে।
আমি মনে করি, কষ্ট সহ্য করতে না পারলে এই কাজ শেখা সম্ভব না। আসলে আমাদের কাজের অনেকগুলো দিক আছে। যেমন—ইঞ্জিন সাইডের সমস্যা, ওয়্যারিং সাইডের সমস্যা, চাকার সমস্যা, চেইনের সমস্যা। আমরা প্রথমে সমস্যাটা কোথা থেকে আসছে সেটা ভাগ করে চিন্তা করি। তারপর সমস্যাটা শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী ট্রিটমেন্ট দেই। সব কাজ একবারে হয় না। গাড়ি একবারেই খোলা হয়, কিন্তু কাজগুলো ধাপে ধাপে করা হয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি—একজন গ্রাহককে ভালো সার্ভিস দেওয়া, ভালো ব্যবহার করা এবং সন্তুষ্ট করে বিদায় দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই হয়তো অনেক দূর থেকেও কাস্টমার আসে।
একটা ঘটনা বলি। ভরত খালি ফুলছড়ি এলাকার এক কাস্টমার ছিলেন, যাকে আমি দুলাভাই বলেই ডাকি। তার নাম ফেকু ভাই। একদিন দুপুর প্রায় ২টার দিকে তিনি আমার দোকানের ক্যাশ টেবিলের পাশে একটা ব্যাগ রেখে চলে যান। আমি জানতাম না ব্যাগের ভেতরে কী আছে। রাত প্রায় ১০টার দিকে তিনি আমাকে ফোন করে বলেন, “রাহান, তোর টেবিলের পাশে একটা কালো ব্যাগ আছে, ওটার ভেতরে অনেক টাকা।”
আমি তখন গিয়ে দেখি ব্যাগটা ঠিকই আছে, টাকাসহ সব ঠিক আছে। পরে তিনি বলেন, ব্যাগের ভেতরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা আছে। আমি ব্যাগটা বাসায় নিয়ে রাখি। পরের দিন তিনি এসে ব্যাগটা নিয়ে যান।
নিজের ব্যবসা হওয়ার একটা স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। ওস্তাদের দোকানে কাজ করার সময় কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল—কোথাও যেতে চাইলে যাওয়া যেত না। সেই জায়গা থেকে নিজের দোকানে আমি ভালো আছি। তবে পরিশ্রমের দিক থেকে ওস্তাদের দোকানে যেমন খাটতাম, নিজের দোকানেও ঠিক তেমনই খাটি।
আমি বাড়িঘর বানাইনি। আমার বাবার যেটুকু আছে, সেখানেই থাকি। চাপাদাহ বিএল স্কুল মার্কেটে একটা দোকান কিনেছি। দুইটা বাচ্চাকে লেখাপড়া করাই। আমার মা আছেন, তাকে একটু সহযোগিতা করি। এই নিয়েই সংসার চলে।
এই যুগে আহামরি কিছু করা খুব কঠিন। সারাদিনে যদি ১৫০০ টাকা আয় হয়, আমার মতে প্রায় ১২০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। বাকি ২০০–৩০০ টাকা দিয়ে খুব বেশি কিছু করা যায় না। তবুও আল্লাহ পাক যেভাবে রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ আমরা ভালো আছি।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো—যতদিন শরীর ভালো থাকবে, আল্লাহ পাক যতদিন সুস্থ রাখবেন, ততদিন এই ব্যবসার সাথেই থাকবো। দোকানঘরটা নিজস্ব না, ভাড়া নেওয়া। এখানে না থাকলে অন্য কোথাও যেতে হতে পারে। তবে এই ব্যবসাটাকে আরও সুন্দর, আরও গুছানোভাবে করার একটা পরিকল্পনা আমার আছে।



