তবলাই যার জীবন!

তবলা

আমি মাহমুদ সাগর মোহাব্বত। আমি একজন সংস্কৃতিকর্মী। মূলত যন্ত্রসংগীত, তবলার সঙ্গে আমি প্রায় ৪৫–৪৬ বছর ধরে জড়িত। শেখার জন্য তখন তেমন পরিবেশ ছিল না। আমার শিক্ষক ছিলেন সূর্যকণা সংগীত নিকেতনের প্রমত সাহা। প্রথম যখন সুযোগ পাই, তার কাছেই শেখা শুরু করি। এই শেখাটা সহজ ছিল না। অনেক বাধা পেরিয়ে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়েছি।

এভাবে করতে করতে আমার একটা তবলার স্কুল হয়েছে—টালনন্দন। এখানে আমি ছোটদের তবলা শিখাই। প্রায় ২০–২২ বছর হবে। এখান থেকে আমি কিছু ছাত্র তৈরি করে রেখে যেতে চাই ভবিষ্যতের জন্য। একসময় আমি অসুস্থ হব, হয়তো থাকব না। তখন ওরা যেন থাকে। আমি যেন এটা দেখে যেতে পারি যে আমার মতো কষ্ট না করে ওরা বাজাচ্ছে।

আমার কিছু স্টুডেন্ট আছে, ওরা এখন তবলা বাজায়, ইলেকট্রিক ইন্সট্রুমেন্টও বাজায়। মানিক আছে, প্রবীর আছে। আমাকে নিয়ে গেয়ে গেছে। মূলত সূর্যকণা সংগীত নিকেতনের খাজ সুজন আমাদের একজন বড় ভাই। তার হাত ধরেই আমার তবলার হাতে খড়ি। সে জিজ্ঞেস করেছিল, তুই কি কিছু শিখতে চাস? আমার বড় বোন বলল। আমি এমনিই বলেছিলাম যে আমি তবলা শিখব। তারপর আমাকে নিয়ে গিয়ে তবলা কিনে দিল—এক জোড়া তবলা, তখন দাম ছিল ৮০ টাকা। তখনই শেখা শুরু করি প্রমত সাহার কাছে।

তারপর থেকে বহুদিন সূর্যকণাতেই ছিলাম। ওখানেই আমার ভিতটা শক্ত হয়েছে। আমার ইচ্ছা ছিল, ভালোবাসা ছিল, বিশ্বাস ছিল। তখন ভাবিনি যে আমি শেখাব। শুধু আনন্দ নিয়ে কাজটা করতাম। বিশ্বাস না থাকলে, আনন্দ নিয়ে কাজ না করলে, নিজের ভালো না লাগলে কিছুই হয় না।

আমি মূলত ক্লাসিক্যাল তবলা বাদক নই। একবার ঢাকায় তবলার উপর একটি ওয়ার্কশপ করছিলাম। সেখানে অপশন ছিল—ক্লাসিক্যাল শেখা, না কি লঘু সংগীতের সঙ্গে তবলা করা। আমি লঘু সংগীতের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম। কারণ ক্লাসিক্যাল করতে গেলে প্রচুর সময় দিতে হয়। তখন আমার বয়স কম ছিল, বুঝিনি। ক্লাসিক্যাল বেসটা মোটামুটি করেছি, কিন্তু সেটা এখন খুব কাজে লাগে না। তবে আমি নিয়মিত রেয়াজ করি। রেয়াজ খুব দরকার। আর গুরু ছাড়া কিছুই হয় না।

আমার প্রিয় তাল দাদ্রা। ছয় মাত্রার তাল, তিন তিন ছন্দে বিভক্ত। দাদ্রা তালের সঙ্গে যেসব গান হয়, সেগুলো খুব মধুর। তাই এই তালটা আমার খুব ভালো লাগে। এটা খুব মিষ্টি একটা তাল।

রবীন্দ্র সংগীতে যে তালগুলো আছে, যেমন ঝম্পক তাল—পাঁচ মাত্রার—এগুলো বিষমপতি তাল। তাল মূলত দুই প্রকার—সমপতি ও বিষমপতি। রবীন্দ্র সংগীতের সৃষ্ট তালগুলো বেশিরভাগই বিষমপতি। তবলা মূলত সংগত। যারা গান করবে বা যন্ত্রসংগীত বাজাবে, তাদের সঙ্গে তবলার সংগত করতে হয়। তারা যেভাবে বাজাবে বা গাইবে, তবলা সেভাবেই বাজাতে হবে। দ্রুত করলে দ্রুত, বিলম্বিত করলে বিলম্বিত।

ধরা যাক, আমি ৪৮ মাত্রার একতালে বাজাচ্ছি, আর সে একই একতালে গান করছে। এটা পুরোই অংকের হিসাব। দুইজনের অংক এক হতে হবে। সে যখন দ্রুত করবে, আমাকেও দ্রুত করতে হবে।

এখন তবলার প্রচলন কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী খুব কম। অনেক অভিভাবক বলেন, দুই বছর হয়ে গেল একটা তাল শিখতে পারল না। গান হলে ছয় মাসে দুইটা গান শেখা যায়। কিন্তু তবলা খুব কঠিন একটা বিষয়। এটা এক মন দিয়ে সাধনা করতে হয়।

এই তবলাটা আমার প্রথম তবলা। প্রায় ৪১–৪২ বছর আগে এইটাতেই আমার হাতে খড়ি হয়েছিল। এখনো এটা আমি রেখে দিয়েছি। এই তবলা দিয়েই আমি ছাত্রদের শেখাই। নতুন তবলা আছে, কিন্তু এইটার মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি। তবলাগুলো আমার সন্তানের মতো।

আগে একটা স্কেলের তবলাই থাকত। এখন স্কেল চেঞ্জার তবলা এসেছে। এখনকার ছেলেরা পুরনো এক স্কেলের তবলা রাখতে চায় না। তিন ইন ওয়ান, চার স্কেলের তবলা চায়। তবলার প্রতি আগ্রহ কম। অনেককে ফোন করে ডেকে আনতে হয়। অনেকে ক্লাসে আসবে বলে আর আসে না। ফিডব্যাক না পাওয়াতেই হয়তো আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

সংস্কৃতির পরিবেশ না থাকলে, সুযোগ না দিলে, ওরা সামনে এগোতে পারবে না। ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

তবলা আঙ্গুল দিয়ে বাজাতে হয়। ইলেকট্রিক হলেও আঙ্গুল দিয়েই বাজাতে হয়। পারকাশন যন্ত্র কাঠি দিয়ে বাজানো হয়, কিন্তু তবলার জন্য আঙ্গুলের কাজ শিখতেই হবে। বাজনাটা পরিষ্কার হতে হবে, লয় ঠিক থাকতে হবে। লয় না থাকলে তবলার কোনো জায়গা নেই।

শুরুর সময়টা আমার ভালো ছিল না। অনেকেই সুযোগ দেয়নি। স্টেজ থেকে বলেছে—তোমাকে দিয়ে হবে না। আমি চলে এসেছি। একসময় তবলা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছি। কিন্তু আমার গুরুজি আমাকে আবার ধরে ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি বলেছিলেন, যারা আজকে তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, একদিন তারাই ডাকবে। কিন্তু তার জন্য সময় পার করতে হবে।

আমি ধীরে ধীরে এগিয়েছি। এখনো আছি। ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেই। আমি যা পেয়েছি, মনে করি অনেক পেয়েছি—ভালোবাসা পেয়েছি। আমার আদর্শ হলো ভালো মানুষ হওয়া। তবলা শিখি, লেখাপড়া করি—সবকিছুর আগে ভালো মানুষ হতে হবে।

এটা ডেভিড কোম্পানিপাড়া, দাস বেকারি মোড়ের সামনে। আমার নাম বললেই এখানে সবাই চিনবে।
যোগাযোগ নম্বর: ০১৭১২৬২৯৩৭০