বিশ্ব শিক্ষক দিবস: সম্মানের গল্পে বঞ্চনার ছায়া
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আগে জেলার সরকারি প্রাথমিক, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও শিক্ষকদের জীবন ঘুরে দেখা গেল, সবার গল্পের মূলসুর এক। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি ও ওষুধের দাম বেড়েছে, শিক্ষকের আয় সেই হারে বাড়েনি।
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা:
গ্রামের পথে শিক্ষককে দেখলে এখনো অনেকে থমকে দাঁড়ান, মাথা নিচু করে সালাম দেন। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার পলিতে গড়া গাইবান্ধার চরাঞ্চলেও এই রীতি পুরোপুরি হারায়নি। কিন্তু সালাম পাওয়া মানুষটি ঘরে ফিরে দেখেন, সংসারের হিসাব মেলে না। সম্মান আছে, তবে তাঁর পেটের হিসাব, ওষুধের খরচ আর সন্তানের পড়ার খরচ নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আগে জেলার সরকারি প্রাথমিক, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও শিক্ষকদের জীবন ঘুরে দেখা গেল, সবার গল্পের মূলসুর এক। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, জ্বালানি ও ওষুধের দাম বেড়েছে, শিক্ষকের আয় সেই হারে বাড়েনি।
বাজারের ব্যাগে সম্মান ধরে না
সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জের নদীভাঙনকবলিত চরের স্কুলগুলোতে শিক্ষকদের জীবন আরও কঠিন। বাজারে গিয়ে প্রতিটি পণ্যের দাম কষে কিনতে হয়। অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসা আর সন্তানের পড়ার খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। এই দুশ্চিন্তা নিয়েই পরদিন সকালে তাঁদের শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে হয়। যাঁকে নিজের সংসারে বাকির খাতা খুলতে হয়, সমাজ তাঁকে আগের প্রজন্মের মতো সম্মানের চোখে দেখে কি না, সে প্রশ্ন এখন স্থানীয়ভাবেই উঠছে।
একই যোগ্যতা, ভিন্ন গ্রেড
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা এখনো ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। ২০১৯ সালের নিয়োগবিধিতে এই পদে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা করা হয়েছে স্নাতক (সম্মান) বা সমমান। অথচ একই যোগ্যতায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা সিনিয়র স্টাফ নার্স ১০ম গ্রেড পান। শিক্ষকেরা তাই এটিকে শুধু একটি অঙ্ক হিসেবে দেখেন না, দেখেন রাষ্ট্রের চোখে নিজেদের অবস্থানের নীরব বার্তা হিসেবে।
নতুন যোগ দেওয়া একজন সহকারী শিক্ষকের মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিনসহ অন্যান্য ভাতা যোগ করে কল্যাণ তহবিলের কর্তনের আগে হাতে আসে সাড়ে ১৮ হাজার টাকার কাছাকাছি। চার-পাঁচ সদস্যের পরিবারে এই টাকায় কুলায় না বলে শিক্ষকেরা জানান। তাই তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ১০ম গ্রেডের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকার পে-কমিশন ও একাধিক পর্যালোচনা কমিটি করেছে, কিন্তু চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন এখনো আসেনি।
চাকরি পেয়েও অপেক্ষা
চাকরিতে ঢোকার আগেই অনিশ্চয়তার উদাহরণ গাইবান্ধার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। জেলায় সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেয়েছিলেন ৪৫৬ জন। আটজন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেননি। বাকি ৪১ জনের নিয়োগপত্র আটকে আছে, কারণ পুলিশ ভেরিফিকেশন নাকি ‘সন্তোষজনক নয়’।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ৪১ জনের বেশির ভাগ অতি দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের সন্তান। গোবিন্দগঞ্জের কাটাবাড়ির আবু তালহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। সাঘাটার আল আমিন সরকার লিমন সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন। পলাশবাড়ীর নুরবানু ঝর্ণা মা হারানোর শোকের মধ্যেও সরকারি চাকরিতে পরিবারের ভরসা খুঁজেছিলেন। প্রার্থীদের দাবি, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা ফৌজদারি মামলা নেই।
বঞ্চিত প্রার্থীরা জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে দ্রুত পদায়ন চেয়েছেন। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষণ কুমার জানান, প্রতিবেদন সন্তোষজনক নয় বলা হলেও ঠিক কী কারণে, তা তাঁদের কাছেও স্পষ্ট নয়। মেধা যখন অস্পষ্ট প্রশ্নে আটকে যায়, তখন ‘যোগ্যতাই সব’ কথাটি আর ভরসা জোগায় না।
এমপিওভুক্তের ফাঁক, নন-এমপিওর শূন্যতা
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মূল ভার বহন করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। এমপিওভুক্তরা শতভাগ মূল বেতন পান, কিন্তু অন্য সুবিধায় অনেক পিছিয়ে। সম্প্রতি তাঁদের বাড়িভাড়া ৫০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। অন্যদিকে সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা মূল বেতনের ৪৪ থেকে ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া এবং দেড় থেকে চার হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পান।
নন-এমপিও শিক্ষকদের অবস্থা আরও করুণ। গাইবান্ধার বিভিন্ন উপজেলা ও চরের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় দশ থেকে পঁচিশ বছর ধরে বিনা বেতনে পড়াচ্ছেন শত শত শিক্ষক-কর্মচারী। সংসার চালাতে অনেকে খেতমজুরি, দিনমজুরি বা টিউশনি করেন। সকালে যিনি ক্লাসে পড়ান, বিকেলে তিনি মাঠে মজুরি খাটেন। তাঁর কাছে ‘সম্মান’ শব্দটি একটি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কী?
অনিয়মের ছায়া
আর্থিক টানাপড়েনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পর্যায়ের অনিয়মও শিক্ষকদের ভাবমূর্তিকে আঘাত করছে। গাইবান্ধা সদরের উত্তর গিদারী দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলুছুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনুপস্থিতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি মানববন্ধন করেছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। এগুলো অভিযোগ মাত্র, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায়। তবে এমন খবর সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থানকেও অজান্তে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মেধাবীরা কেন মুখ ফেরাচ্ছেন
গাইবান্ধার এই চিত্র একটি বড়ো জাতীয় প্রশ্নের অংশ, মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছেন না কেন? শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এর শিকড় বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে সরকারি কলেজের লেকচারারের বেতন ছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের চেয়ে এক ধাপ ওপরে। পরে আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ায় মেধাবীদের আকর্ষণ প্রশাসনের দিকে সরে যায়, আর শিক্ষকদের বাড়তি ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির কাঠামোও ক্রমে সংকুচিত হয়।
শিক্ষা ক্যাডারেও একই অভিযোগ। পদোন্নতি সময়মতো হয় না, অনেককে ১০ থেকে ১৫ বছর প্রভাষক পদে থাকতে হয়, আর এই ক্যাডার থেকে সচিব হওয়ার সুযোগও নেই। ফলে বিসিএসে মেধাবীদের প্রথম পছন্দ থাকে পররাষ্ট্র, প্রশাসন বা পুলিশ। গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোর দুর্বলতাও বড়ো বাধা। শ্রেণিকক্ষ কম, পানীয় জল ও স্যানিটেশনের ঘাটতি আছে, অনেক কলেজে অন্তত ২৫ জন শিক্ষক থাকার কথা, কিন্তু আছেন চার-পাঁচজন। শিক্ষা আইনের খসড়া নিয়েও শঙ্কা আছে। শিক্ষকদের মৌলিক অধিকার নিয়ে সেখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।
এরপর কী
শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের দাবি, সুনির্দিষ্ট। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা এবং সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাতার ব্যবধান কমানো তাঁদের প্রধান দাবি। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত এমপিওভুক্ত করা এবং গাইবান্ধার ৪১ জনের নিয়োগে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ যাচাই চালুর কথাও তাঁরা বলছেন। শিক্ষাবিদেরা আরও চান, শিক্ষা ক্যাডারে সময়মতো পদোন্নতি নিশ্চিত হোক, বিদ্যালয়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক, আর শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হোক।
চরের পথে আজও কেউ শিক্ষককে সালাম দেন। সেই সালাম সত্যিকারের শ্রদ্ধার প্রকাশ, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু শ্রদ্ধা দিয়ে চালের দাম মেটে না, ওষুধ কেনা যায় না, মেধাবী তরুণকেও এই পেশায় টানা যায় না। যে শিক্ষক আজও সময়মতো ক্লাসে ঢোকেন, তাঁর সংসারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের দায়। তা না হলে সালাম থেকে যাবে শুধু একটি অভ্যাস, আর শিক্ষকতার জন্য যে মেধার দরকার, তা অন্য দরজায় কড়া নাড়তে থাকবে।
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী