বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু: কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলের আর্থিক সচ্ছলতার নতুন দুয়ার
প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে চলে আসা দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি তাই কোনো হঠাৎ উত্থিত আন্দোলন নয়- বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার একটি স্বাভাবিক পরিণতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জোরালো যুক্তির ভিত্তি পেয়েছে।
আশরাফুল আলম :
একসময়ের ব্যস্ত বাণিজ্যিক বন্দর বালাসীঘাট আজ নাব্য সংকটে স্তব্ধ। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের লাখো কৃষকের ভাগ্য বদলে যেতে পারে।
গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম- উত্তরাঞ্চলের এই দুই জেলা একসময় মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী এই জনপদে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তৃতি কখনোই ঘটেনি, অথচ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি নদীপথ ও নদীবন্দরকে কেন্দ্র করেই গতিশীল থেকেছে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার কেতকিরহাট সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে অবস্থিত বালাসীঘাট নব্বইয়ের দশকে নৌ ও রেল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। কিন্তু নাব্যতা সংকটে বিশাল এলাকাজুড়ে বালুচর জেগে ওঠায় নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়, আর তখন থেকেই এই জনপদের অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যে নেমে আসে স্থবিরতা।
বন্ধ বন্দরের মূল্য: বেকারত্ব, অপরাধ ও জনস্রোত
বন্দর বন্ধ হওয়ার পর জীবিকার সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। এই সংকট কাউকে ঠেলে দিয়েছে অসৎ পথে, কাউকে বাধ্য করেছে পরিবার-পরিজন নিয়ে ভিন্ন জেলায় পাড়ি জমাতে। প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে চলে আসা দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি তাই কোনো হঠাৎ উত্থিত আন্দোলন নয়- বরং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার একটি স্বাভাবিক পরিণতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জোরালো যুক্তির ভিত্তি পেয়েছে।
কৃষি অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য রূপান্তর
বালাসীঘাট এলাকার কৃষি মূলত বালুচরনির্ভর উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে। ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, মিষ্টি আলু, কাউন, ডাল, তিল ও তিশির মতো ফসল এখানে উৎপাদিত হয়ে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। তবে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত উৎপাদক কৃষকেরা প্রায়ই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধার চার উপজেলা- ফুলছড়ি, সাঘাটা, গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জের ১৬৫টি চরে বসবাসরত প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। নদীর দুই পাড়ে কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার নির্মিত হলে চরের প্রায় ১০ হাজার কৃষক ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় আর স্বল্প মূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠতে পারে, যা তৈরি করবে নতুন কর্মসংস্থান।
যমুনা বহুমুখী সেতুর ওপর চাপ হ্রাস
বালাসীঘাটে সেতু নির্মিত হলে সিরাজগঞ্জের যমুনা বহুমুখী সেতুর ওপর বর্তমান চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যানজট হ্রাস পাবে এবং পণ্য পরিবহনে সময় ও অর্থ- উভয় সাশ্রয় হবে। উত্তরাঞ্চলের প্রায় আট জেলার বাণিজ্যিক সুবিধাও এতে নিশ্চিত হবে।
প্রসঙ্গত, অতীতে নদীতে লঞ্চ চলাচলের পরিকল্পনায় ড্রেজিং করে সাময়িকভাবে যাত্রা শুরু হলেও তিন মাসের মধ্যেই নাব্যতা সংকটে তা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুই পাড়ের টার্মিনাল বর্তমানে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সেতু নির্মিত হলে এই বিদ্যমান অবকাঠামো ও অধিগ্রহণকৃত জমি কাজে লাগানো সম্ভব হবে, যা রাষ্ট্রীয় ব্যয় সাশ্রয়েও সহায়ক হবে।
বিকল্প প্রস্তাবের তুলনামূলক যুক্তি
বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে সেতু নির্মাণের প্রস্তাবের বিপরীতে যুক্তি হলো, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের যমুনা বহুমুখী সেতুর দূরত্ব মাত্র ৮৬ কিলোমিটার- এত কাছাকাছি দূরত্বে একই মানের আরেকটি সেতু নির্মাণ রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে যৌক্তিক কি না, তা বিবেচনার দাবি রাখে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বগুড়া থেকে যমুনা বহুমুখী সেতু পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের চলমান পরিকল্পনার তথ্যও, যা সারিয়াকান্দি প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।
নদীভাঙন রোধ ও পরিবেশগত রূপান্তর
গাইবান্ধা জেলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বর্ষা মৌসুমের নদীভাঙন, যা প্রতিবছর বহু কৃষক পরিবারকে সহায়সম্বলহীন করে তোলে। সেতু নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত নদীশাসন কার্যক্রম- যেমন দুই তীরে ব্লক বাঁধাই- দীর্ঘমেয়াদে ভাঙন রোধ করে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি রক্ষা করতে পারে। পাশাপাশি নদীর মধ্যে জেগে ওঠা কাশবনময় বালুচরকে ঘিরে বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে, যা এলাকার ছোট পরিবারগুলোর বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
সমতাভিত্তিক উন্নয়নের প্রশ্ন
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-তে অঙ্গীকার করা হয়েছে, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। এই আলোকে বিচার করলে, চরাঞ্চলের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের আর্থ-সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বালাসীঘাটে সেতু নির্মাণের গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাট থেকে শুরু করে ধান, সবজি, ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সহজ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন এবং এলাকার কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
সবমিলিয়ে, বালাসীঘাটের দ্বিতীয় যমুনা সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়- উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও স্বপ্নের একটি বাস্তব প্রতিফলন, যা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
* লেখক ও উন্নয়নকর্মী।