বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু: উত্তরবঙ্গের আরেকটি স্বপ্ন
গাইবান্ধার বালাসী আর জামালপুরের বাহাদুরাবাদের মধ্যে যদি একটি সেতু গড়ে ওঠে, তাহলে লাভবান হবে শুধু দুটি জেলা নয়; বদলে যেতে পারে সমগ্র উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থা।
আনিসুল হক :
নদী আশীর্বাদ। পৃথিবীর বড় বড় সভ্যতা নদীর তীরেই জন্ম নিয়েছে। বাংলাও নদীর দেশ। নদী আমাদের দিয়েছে উর্বর মাটি, মাছ, বাণিজ্যের পথ, গান, কবিতা। কিন্তু নদীর দুই তীরের মানুষের মিলন সম্পূর্ণ হয় তখনই, যখন নদীর ওপর একটি সেতু দাঁড়ায়। সেতু শুধু কংক্রিট আর ইস্পাতের নির্মাণ নয়; সেতু সময়কে ছোট করে, দূরত্বকে কাছে আনে, মানুষের জীবনকে সহজ করে।
যমুনা সেতু হওয়ার আগে উত্তরবঙ্গ যেন একটু দূরের বাংলাদেশ ছিল। সেই সেতু দেশের অর্থনীতির মানচিত্র বদলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, যমুনার বুকে আরেকটি সেতুর সময় কি এসে যায়নি?
গাইবান্ধার বালাসী আর জামালপুরের বাহাদুরাবাদের মধ্যে যদি একটি সেতু গড়ে ওঠে, তাহলে লাভবান হবে শুধু দুটি জেলা নয়; বদলে যেতে পারে সমগ্র উত্তরবঙ্গের যোগাযোগব্যবস্থা।
আজ রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট কিংবা গাইবান্ধা থেকে ঢাকা বা ময়মনসিংহে যেতে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়। পথ যত দীর্ঘ হয়, মানুষের জীবনও তত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। জ্বালানি খরচ বাড়ে, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয়। একটি সেতু সেই অদৃশ্য ক্ষতিগুলো কমিয়ে আনতে পারে। যে পথ আজ দীর্ঘ, তা ছোট হবে; যে যাত্রা আজ ক্লান্তিকর, তা সহজ হবে।
কৃষক সবচেয়ে আগে এর সুফল পাবেন। উত্তরবঙ্গের মাঠে যে আলু জন্মায়, যে ভুট্টা, ধান কিংবা শাকসবজি উৎপাদিত হয়, সেগুলো দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে পারলে কৃষকের আয় বাড়বে। যোগাযোগ উন্নত হলে শিল্পও আসে। গুদাম হয়, কোল্ড স্টোরেজ হয়, কারখানা হয়, কর্মসংস্থান তৈরি হয়। একটি সেতু অনেক সময় একটি অঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন জীবন দেয়।
সেতু মানে শুধু ব্যবসা নয়। এটি একজন রোগীর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে যাওয়ার নিশ্চয়তা। এটি একজন শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সহজ পথ। এটি বন্যা বা দুর্যোগের সময় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ। মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে এসবের মূল্য হিসাবের খাতায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
এই সেতুর আরেকটি গুরুত্ব রয়েছে জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থায়। যমুনা সেতুর ওপর প্রতিদিন যানবাহনের চাপ বাড়ছে। বিকল্প একটি সেতু হলে সেই চাপ ভাগ হয়ে যাবে। একটি দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় বিকল্প পথ থাকা বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চল সেই উন্নয়নের অংশীদার হয়। উত্তরবঙ্গের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তাঁরা শুধু চান সমান সুযোগ। দ্রুত যোগাযোগ, সহজ যাতায়াত, বিনিয়োগের সম্ভাবনা- এসবই সেই সমান সুযোগের অংশ।
অবশ্যই এমন একটি প্রকল্পের আগে কঠোর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দরকার। নদীর গতিপ্রকৃতি, পরিবেশগত প্রভাব, নির্মাণ ব্যয়, অর্থনৈতিক লাভ- সবকিছু গভীরভাবে বিচার করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতেই নেওয়া উচিত।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের আরেকটি কথাও শেখায়। কিছু অবকাঠামো আছে, যেগুলো কেবল আজকের জন্য নির্মিত হয় না; নির্মিত হয় আগামী অর্ধশতকের কথা ভেবে। সেগুলোর প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় বহু বছর পরে।
যদি সমীক্ষা বলে, বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, দেশের অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, তাহলে এটিকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের প্রতি বাংলাদেশের আস্থা হিসেবে দেখা উচিত।
একটি সেতু নদী পার হওয়ার পথ তৈরি করে। আর কিছু সেতু একটি জাতির ভবিষ্যৎ পার হওয়ার পথও তৈরি করে। বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু হয়তো তেমনই একটি সেতু হতে পারে।
* লেখক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সাংবাদিক।