বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু: উত্তরবঙ্গের স্বপ্ন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মিত হলে এ দূরত্ব ১৫০-১৮০ কি.মি. কমবে। যাত্রাপথ ৭ ঘণ্টা থেকে ৩.৫ ঘণ্টায় নেমে আসবে। দূরত্ব কমায় বাস-ট্রাক ভাড়া ৩০-৪০% কমবে। ফেরির অনিশ্চয়তা, বর্ষার ভোগান্তি, শীতের দীর্ঘ লাইন- সবকিছুর অবসান ঘটবে। সময়ের সাশ্রয় মানে জাতীয় উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।

বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু: উত্তরবঙ্গের স্বপ্ন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

মোকছুদার রহমান মাকসুদ :

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবাহিত নদীগুলো যেমন আমাদের সভ্যতার প্রাণ, তেমনি সেতুগুলো সেই প্রাণের স্পন্দনকে এক সুরে বেঁধে দেয়। পদ্মা সেতু যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি যমুনার বুকে প্রস্তাবিত বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু উত্তরবঙ্গের বহু বছরের প্রতীক্ষিত স্বপ্ন পূরণের হাতছানি দিচ্ছে। গাইবান্ধার বালাসীঘাট ও জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাটকে সংযুক্তকারী এই সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়- এটি অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য নিরসন, অর্থনৈতিক মুক্তি ও জাতীয় সংহতির সেতুবন্ধন।

বর্তমানে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধার মানুষকে ঢাকা-ময়মনসিংহ যেতে বাধ্য হয়ে যমুনা সেতু ঘুরে ৩৫০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু নির্মিত হলে এ দূরত্ব ১৫০-১৮০ কি.মি. কমবে। যাত্রাপথ ৭ ঘণ্টা থেকে ৩.৫ ঘণ্টায় নেমে আসবে। দূরত্ব কমায় বাস-ট্রাক ভাড়া ৩০-৪০% কমবে। ফেরির অনিশ্চয়তা, বর্ষার ভোগান্তি, শীতের দীর্ঘ লাইন- সবকিছুর অবসান ঘটবে। সময়ের সাশ্রয় মানে জাতীয় উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে।

উত্তরবঙ্গ বাংলাদেশের ‘শস্য ভাণ্ডার’। এখানকার আলু, ধান, ভুট্টা, তামাকের উৎপাদন জাতীয় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। কিন্তু পচনশীল কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় কৃষক ন্যায্য দাম পান না। সেতু হলে ‘ফার্ম টু টেবিল’ যাত্রা দ্রুত ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি যোগাযোগ সহজ হলে জামালপুর-গাইবান্ধায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, হিমাগার ও ছোট-মাঝারি কারখানা গড়ে উঠবে। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম-গাইবান্ধার চর ও জামালপুরের যমুনার চরাঞ্চলে পর্যটন খাত চাঙ্গা হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

বালাসীঘাট ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৪০ কি.মি. দূরে। সেতু নির্মিত হলে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান-নেপাল ‘সাব-রিজিওনাল কানেকটিভিটি’ জোরদার হবে। ভারতের আসাম-মেঘালয়ের পণ্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সমুদ্রবন্দরে যাবে, আবার বাংলাদেশি পণ্য উত্তর-পূর্ব ভারতে সহজে প্রবেশ করবে। সেইসাথে ইকোনমিক করিডোরের সাথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ই বাড়াবে না, ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ থেকে ‘উন্নত দেশ’ হওয়ার পথে কৌশলগত অগ্রগতি নিশ্চিত করবে।

যমুনা সেতুর বর্তমানে ধারণক্ষমতার ১২০% অতিরিক্ত চাপে পরিচালিত হচ্ছে। দৈনিক হাজার হাজার ট্রাকের লাইন ২০-৩০ কি.মি. পর্যন্ত হয়ে যায়। এই বাড়তি চাপে সেতুর আয়ুষ্কাল হুমকির মুখে। বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু হলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৪০% যানবাহন এ রুটে স্থানান্তরিত হবে। এতে জাতীয় সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং বিকল্প যোগাযোগ রুট তৈরি হওয়ায় যে-কোনো দুর্যোগে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল থাকবে।

দ্রুত যোগাযোগ মানে দ্রুত চিকিৎসা। দুর্ঘটনায় বা জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর জন্য ‘গোল্ডেন আওয়ার’ রক্ষা পাবে। রংপুর মেডিক্যাল থেকে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর সহজ হবে। শিক্ষার্থীরা ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহজে যাতায়াত করতে পারবে। সর্বোপরি, ‘উন্নয়ন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক’- এই অভিযোগ দূর করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।

অনেকে প্রশ্ন তোলেন- সেতু নির্মাণের ব্যয় কি সাশ্রয়ী? উত্তর হলো, এটি ব্যয় নয়, দূরদর্শী বিনিয়োগ। একটি সেতু শুধু লোহা-কংক্রিট দিয়ে গড়া হয় না, এটি গড়ে তোলে একটি অঞ্চলের ভাগ্য, একটি প্রজন্মের স্বপ্ন। পদ্মা সেতু প্রমাণ করেছে- নিজস্ব অর্থায়নে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু হবে উত্তরবঙ্গের ‘পদ্মা সেতু’।

আজকের প্রজন্ম যদি এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর দেখে যায়, আগামী প্রজন্ম সেই সেতুর উপর দিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে ছুটবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই জাতীয় দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে কণ্ঠ মেলাই- জাগো বাহে কোনঠে সবায় ‘বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু চাই, উত্তরবঙ্গের মুক্তি চাই’।

* সাংবাদিক ও সংগঠক।