উন্নয়নবৈষম্য দূরীকরণে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্ধারণী
রংপুর বিভাগের সাথে ঢাকা বিভাগের বৈষম্য প্রায় তিন গুণ। ঢাকা বিভাগের দারিদ্র্য ১৬ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ৪৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। কুড়িগ্রাম জেলার সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলার ব্যবধান প্রায় ২৮ গুণ।
তুহিন ওয়াদুদ :
ইতিহাসের এক করুণ আখ্যানের নাম- ‘উন্নয়নবৈষম্যের তলানিতে রংপুর অঞ্চল।’ ‘রাজা যায়, রাজা আসে’- রংপুর অঞ্চলের সাথে বৈষম্য সৃষ্টিতে কোনও তারতম্য হয় না। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুই পাল্টায়। আমাদের দেশে এরকমটাই দেখে এসেছি। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা বিষয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এতটুকুও পরিবর্তন হয়নি- সেটি রংপুর অঞ্চলের উন্নয়নবৈষম্য। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতাদর্শিক দল দেশ পরিচালনা করেছে কিন্তু রংপুরের সাথে বৈষম্য নীতি একই রকম রেখেছে।
রংপুর অঞ্চলের সাথে অকল্পনীয় এক বৈষম্যের জাল বুনেছে সব সরকার। ইতিহাসে প্রজন্মান্তরে এই বৈষম্য ঘনীভূত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত। একটি পরিবারে একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক কোনও অবস্থাতেই তার ওপর নির্ভরশীলদের সাথে বৈষম্য করতে পারেন না। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এমনকি একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার সমান বয়স ধরে বৈষম্যের তলানিতে থাকবে একটি অঞ্চল- এটি কীভাবে সম্ভব?
আমরা জানি, দেশ পরিচলানা পর্ষদের থাকা ব্যক্তিগণ অভিভাবকস্থানীয়। তারা যখন দেশের উন্নয়নকল্পে কোনও পরিকল্পনা হাজির করবেন, তারা দেখবেন কোন কাজটি সবার আগে করা প্রয়োজন। অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি কাজের পরিকল্পনা সরকারের থাকারই কথা। যেমন ধরা যাকÑ একটি পরিবারে চারজন সদস্য আছে। এই চারজনের মধ্যে একজন আছে প্রধানত যার সংকট একেবারেই মৌলিক চাহিদাতেই। অবশিষ্ট তিনজনের মৌলিক সংকট কেটে গেছে। তারা চায় উন্নত জীবন। একটি পরিবারের ন্যূনতম দায়িত্বশীল অভিভাবক মৌলিক সংকটে থাকা ব্যক্তির সংকট উত্তরণবিষয়ক কার্যক্রম প্রথমত গ্রহণ করবেন।
চার সদস্যের পরিবারের প্রতীকী-রূপক আলাপের খোলস ছেড়ে বাস্তবতার আলাপে আসা যাক। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, উল্লিখিত চার সংখ্যাটি আমাদের ৬৪ জেলাকে বোঝানো হয়েছে। সেই ৬৪টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে গরিব আছে ১০টি জেলা। এই জেলাগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। এই ১০ গরিব জেলার মধ্যে পাঁচটি রংপুর বিভাগে। যেহেতু দশটি গরিব জেলার পাঁচটি জেলা রংপুর বিভাগে, সে কারণে রংপুরও বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে গরিব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর করা দারিদ্র্য মানিচত্র থেকে এসব জানা যায়। অতীতে কখনো কখনো বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাথে বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিও যুক্ত হয়ে দারিদ্র্যমানচিত্র প্রস্তুত করেছে।
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সর্বশেষ যে দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করেছে তার ভিত্তি ভীষণ দুর্বল হওয়ার কারণে তা সমাদৃত হয়নি। আগের দারিদ্র্য মানচিত্রে যে জেলা দেশের সবচেয়ে ধনী তিনটি জেলার মধ্যে ছিল, সেই জেলা মাদারীপুরকে বলা হয়েছে দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা। ওই জেলার মানুষ আন্দোলন করেছে এই সূচকের বিরুদ্ধে। তারা বলেছে তাদের জেলায় এমন কোন দুর্যোগ হয়নি যাতে আগের চেয়ে মানুষ গরিব হবে। অপরপক্ষে দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামে আগের চেয়ে অনেক মানুষ নদীভাঙনে গৃহহীন হয়েছে। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকার কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ফলে সেই জেলায় উন্নয়ন সূচকে অনেক উপরে উঠে যাবে এমনটা হওয়ার কোনও কারণ নেই। এসব কারণে সরকারের শেষ পরিসংখ্যানকে গ্রহণ করাটা বাতুলতা মাত্র।
বাংলাদেশ ছোট একটি দেশ। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও এ দেশের উন্নয়ন ভয়াবহ বৈষম্যমূলক। অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধে মানুষ অকাতরে জীবন দিয়েছেন যে কটি কারণে তার অন্যতম এই বৈষম্য দূরীকরণের আকাঙ্ক্ষা।
২০১০ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতিসংঘ খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ গবেষণা-মতে সারাদেশে গড় দারিদ্র্য ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই বছর রংপুর বিভাগে গড় দারিদ্র্য ছিল ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএস যে দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যায় সারাদেশে গড় দারিদ্র্য ৭ দশমিক ২ শতাংশ কমে হয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের এসে হয়েছে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম গরিব জেলা নারায়ণগঞ্জে দারিদ্র্যের হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ। সারাদেশে যখন দারিদ্র্য কমেছে তখন রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য বেড়েছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশে গড় দারিদ্র্য ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। রংপুর বিভাগের উন্নয়ন যেন ২০০০ সালের গড় উন্নয়নে আটকা পড়ে আছে। ২০১৯ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ উল্লেখ করা হয়। সমতাভিত্তিক উন্নয়নের কথা আমাদের সংবিধানে বলা থাকলেও কার্যকারিতা নেই। বাংলাদেশে যতবার দারিদ্র্য-মানচিত্র প্রকাশিত হয়েছে প্রতিবারই রংপুর অঞ্চল ছিল পিছিয়ে। রংপুর আলাদা বিভাগ হওয়ার পর থেকে বিভাগ হিসেবে রংপুর দারিদ্র্যের শীর্ষে আছে। রংপুরের দারিদ্র্য কমলেও উন্নয়ন বৈষম্য কমেনি।
রংপুর বিভাগের সাথে ঢাকা বিভাগের বৈষম্য প্রায় তিন গুণ। ঢাকা বিভাগের দারিদ্র্য ১৬ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ৪৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। কুড়িগ্রাম জেলার সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলার ব্যবধান প্রায় ২৮ গুণ। নারায়ণগঞ্জে ২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কুড়িগ্রামে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ। দুশোগুণ বৈষম্য রাজিবপুর উপজেলার সাথে গুলশানের। গুলশানে দারিদ্র্য হার দশমিক ৪ শতাংশ এবং রাজিবপুরে ৭৯ শতাংশ। গাইবান্ধা জেলাও দেশের সবচেয়ে গরিব ১০টি জেলার একটি।
‘দারিদ্র্য বাড়ছে, বরাদ্দ বাড়ছেনা’ শিরোনামে রাজিউল হক ও জহির রায়হানের একটি প্রতিবেদন ২০২০ সালে ৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা হয়েছে- ‘বিবিএস বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে কম নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও মাদীরপুর জেলায়। প্রথম দুটি জেলায় এ হার কম-বেশি তিন শতাংশ। তৃতীয়টিতে চার শতাংশ। ছয় বছরের ব্যবধানে জেলাগুলোর দারিদ্র্য অনেক কমেছে। পক্ষান্তরে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও গাইবন্ধায় দারিদ্র্য বেড়েছে।’ ২০১৬ সালের দারিদ্র্য মানিচত্র প্রকাশিত হয়েছিল দুই-তিন বছর পরে। সেখানে রংপুর বিভাগের পাঁচ গরিব জেলার দারিদ্র্য ছিল যথাক্রমেÑ কুড়িগ্রামে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ, দিনাজপুরে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ, রংপুরে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ, লালমিনরহাটে ৪২ শতাংশ।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্যÑ ২০২৪ সালে যে দারিদ্র্য মানিচত্র সরকার প্রকাশ করেছে তা ভীষণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। কেবল গরিব জেলা রদবদল করাই ছিল সেটার উদ্দেশ্য। ২০১৬ সালের তালিকায় দেশের তৃতীয় ধনী জেলা মাদারীপুরকে ২০২৪ সালে দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। যেহেতু রংপুর বিভাগের গরিব জেলাগুলোয় ২০১৬ সালের পরও প্রতিবছর উন্নয়নে কম বরাদ্দ দিয়েছে, সরকার এমনকি এদের ভাগ্যোন্নয়নে কোন বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেনি তাই নিশ্চিত করে বলা যায়- রংপুর বিভাগের গরিব জেলাগুলো এখনো গরিবই আছে।
সরকার রংপুর বিভাগের জন্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে তেমন বরাদ্দ দেয় না বললেই চলে। রাষ্ট্রের ভেতরে নাকি বাইরে আছে রংপুর বিভাগ এটা ভেবে অবাক হতে হয়। এক বছরের বরাদ্দের হার উল্লেখ করছি। প্রতিবছরই এরকম, নয়তো এর চেয় কম বরাদ্দ থাকে। ২০১৯ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দ ছিল এক লাখ ছিয়াত্তর হাজার ছয় শত কোটি টাকা। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের দুই কোটি মানুষের জন্য এক শতাংশের কম বরাদ্দ ছিল। মেগাপ্রকল্প বাদ দিলে মাত্র দশমিক ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ ছিল রংপুর বিভাগের জন্য। মেগাপ্রকল্পসহ হিসাব করলে সেই বরাদ্দ আধা শতাংশে নেমে আসবে। এ অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের উন্নয়ন বৈষম্য বৃদ্ধির এটিও কারণ। রংপুর বিভাগে একটিও মেগা প্রকল্প নেই।
২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলনে উৎখাত হওয়া আওয়ামীলীগ সরকার ১০টি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। প্রকল্পগুলোÑ পদ্মা বহুমুখী সেতু, দোহাজারি রামু-কক্সবাজার-ধুমধুম রেলপথ, পদ্মা রেল সেতু সংযোগ, রূপপুর পারমাণবিক বিদুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল প্রকল্প, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, রামপাল পাওয়ার প্রজেক্ট, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মহেশখালি এলএনজি টার্মিনাল। সোনাদিয়া এবং পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর বাদ দিলেও অন্যান্য প্রকল্পগুলোতে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়েছে টাকারও পরিমাণ। বিদেশের টাকার সাথে আছে দেশের নিজস্ব অর্থায়ন। প্রকল্প গ্রহণের সময়ে এই টাকা সারাদেশের এক বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয়ের চেয়েও অনেক বেশি ছিল।
উল্লিখিত ১০টি মেগা প্রকল্পের একটিও রংপুর বিভাগে নেই। কেউ কেউ ভাবতে পারেন এটি আলাদা করে দেখা বিশেষ কিছু নয়। কারণ বিভাগ ধরে তো আর মেগাপ্রকল্প নেওয়া হয়নি। আবার দেশের যে কোনও প্রান্তে উন্নয়ন হোক না কেন, তা তো সবার উন্নয়ন। কিন্তু তারপরও সবচেয়ে বঞ্চিত-অবহেলিত-উপেক্ষিত রংপুর বিভাগে কোনও মেগাপ্রকল্প না হওয়া ভাবনার উদ্রেক করে। এর প্রধানতম কারণ রংপুরের সাথে সরকারের চরমতম বিমাতাসুলভ আচরণ। এই বিমাতাসুলভ আচরণের অগণিত দৃষ্টান্ত রয়েছে। মোটাদাগে বলা যায়- দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সরকার যখন গ্রহণ করে, তার এক শতাংশেরও কম বরাদ্দ থাকে রংপুর বিভাগের দুই কোটি মানুষের জন্য।
দেশে মোট অর্থনৈতিক অঞ্চল সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ১০০টি। রংপুর বিভাগের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে অর্থনৈতিক অঞ্চল মাত্র চারটি। বিভাগের আয়তন, জনসংখ্যা এবং প্রয়োজনের হিসাব করলে এখানে অন্তত ২০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়া প্রয়োজন। রংপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুরের অর্থনৈতিক অঞ্চল বলা যায় ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রংপুর বিভাগে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল নেই। সরকারের কাছে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের প্রণোদনার দাবি ছিল। রংপুরে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠায় সরকার যদি বিশেষ প্রণোদনা দেয় তাহলে এখানে অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে পারে। সেই আশা দূরাশামাত্র।
দেশের উন্নয়ন যখন তরতর করে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তখন রংপুর বিভাগের গড় দারিদ্র্য তরতর করে বেড়েছে। এই বিভাগ থেকে দেশের সবচেয়ে কম জনশক্তি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। রংপুরে দুই কোটি মানুষ হলেও এখানে খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয় প্রায় চার কোটি মানুষের। রংপুর বিভাগ এখন দেশের খাদ্যের জোগানদাতা, আর উন্নয়নের সুফল ভোগকারী অন্যান্য বিভাগের মানুষ। এমন বৈষম্য কেবল অন্যায়ই নয়, অমানবিকও।
দেশের ভেতরে উন্নয়ন কখনোই সুষম হয়নি। ক্ষমতার বাইরে থাকাও নাকি একটি বড় কারণ। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। রংপুরে তখন জাতীয় পার্টির দাপট। ফলে সমতাভিত্তিক কিংবা পিছিয়ে পড়া অঞ্চলেকে এগিয়ে নেওয়ার মতো উন্নয়ন হয়নি বলে জানা যায়। এরপর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। তখনো জাতীয় পার্টিরই একচ্ছত্র আধিপত্য। তখনো উন্নয়ন হয়নি। ২০০১ সালে আবারও বিএনপি ক্ষমতায় আসে। তখনো রংপুরে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিল খুব কম। ফলে এই পাঁচ বছরেও কোনও মনোযোগ ছিল না এই সরকারের। রাজনৈতিক ক্ষতায়ন না হওয়ায় রংপুর বিভাগ সবসময়ই উন্নয়নবৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। ২০০৮ সাল থেকে মহাজোট সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায়। এই সরকারের সময়ে দেশে প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হলেও তা চরম বৈষম্যপূর্ণ ।
২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের সংসদ সদস্যগণ প্রধানত সরকারদলীয় হওয়ার পরও এখানে প্রতিবছর কেন উন্নয়ন বৈষম্য বেড়েছে? বোঝা যায়, কেবল রাজনৈতিক কারণে এখানে উন্নয়ন থেমে গেছে তা নয়। যখন যারাই দেশ পরিচালনায় থাকুক না কেন রংপুরের উন্নয়নবৈষম্য দূর হচ্ছে না। রংপুরের উন্নয়নবৈষম্য দূরীকরণের ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনিও যে দেড় বছর দেশ পরিচালনা করেছেন এই সময়ে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করে গেছেন।
রংপুর বিভাগের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে কখনোই ঐক্যবদ্ধ হয়ে রংপুরের উন্নয়নের কাজে নেমে পড়তে দেখা যায়নি। আমরা শুনি, উন্নয়নের প্রশ্নে দেশের অন্যসব অঞ্চলের রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ মতাদর্শ ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকেন। রংপুরে এমনটি নেই। রংপুরের জন্য চাওয়ার ক্ষেত্রেও দীনতা আছে।
রংপুর অঞ্চলের মানুষের কল্যাণের কথা সরকার বিবেচনা করলে এখানে সবার আগে সরকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করত। এ অঞ্চলে মেগা প্রকল্প হলে জাতীয় এবং আঞ্চলিকভাবে তার প্রভাব পড়ত। এখানে যদি উন্নয়ন হয় তাহলে দেশের গড় দারিদ্র্য দ্রুতই অনেক কমে যাবে। রংপুর অঞ্চলের মানুষের গরিব হয়ে থাকার সবচেয়ে বড়ো কারণ এখানকার কঠিন যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদী ভাঙন আর বন্যা। এই অঞ্চলের নদী ভাঙন আর বন্যা রোধে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির আলোকে একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা জরুরি ছিল। এ অঞ্চলে আছে হাজার হাজার চর। চরকেন্দ্রিক উন্নয়ন মেগা প্রকল্প অনায়াসে হতে পারত। ব্রহ্মপুত্রের ওপরে অনায়াসে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া যেত। রংপুর অঞ্চলের রেলব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা যেত। কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলায় সরকার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে পারত। এমনকি যে কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে প্রণোদনাভিত্তিক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা যেত।
সরকারের উচিত রংপুর অঞ্চলের গণমানুষের উন্নয়নে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা। তিস্তা নদীকে ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি। মহাপরিকল্পনা হোক কিংবা অন্য কোনও প্রকল্প হোক, বিজ্ঞানসম্মতভাবে নদী, নদীপাড়ের মানুষের স্বার্থে তা গ্রহণ করা জরুরি। তিস্তার সুরক্ষায় সাড়ে বারো হাজার কোটি টাকার কথা বলা হয়েছে। এই টাকায় কিংবা তারও বেশি টাকায় যদি নদীটির বিজ্ঞান সম্মতভাবে পরিচর্যা করা যায়, তাহলে রংপুর অঞ্চলের গড় দারিদ্র্যের হার দ্রুতই কমিয়ে আনবে।
রংপুর অঞ্চলের সাথে বৈষম্য দূরীকরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য, রংপুর বিভাগের সব জেলার সাথে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে সেটাকে অবশ্যই উদ্ভট বলতে হবে। প্রথমে রেল যোগাযোগের কথা বলি। রংপুরের সাথে ঢাকার কিংবা রংপুরের সাথে কোনো অঞ্চলের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক নয়। রংপুরে অনেক জেলায় ব্রডগেজ রেল লাইন না থাকার কারণে রাজশাহী, খুলনার সাথে সরাসরি রেল যোগাযোগ অনেকগুলো জেলার সাথে গড়ে ওঠেনি। আবার রেলপথে ঢাকা যাওয়ার যে চিত্র, সেটি কেবল উদ্ভটই নয়, হাস্যকরও বটে। ব্রিটিশরা কলকাতার সাথে আসামের রেল যোগাযোগ গড়ে তুলেছিল। ওই রেলপথে রংপুরবাসী ঢাকা যায়। রংপুর বিভাগের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঢাকার অবস্থান। এই সোজাপথে রংপুর ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠা প্রয়োজন ছিল। এই কাজ করা হয়নি। বর্তমানে রেলপথে ঢাকা যেতে রংপুর থেকে প্রথমে কাউনিয়া যেতে হয় সোজা পূর্বে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এরপর বিভিন্ন দিকে ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিমে নাটোরে যেতে হয় প্রায় ২০০ কিলোমিটার। সেখান থেকে পূর্বদিকে ঢাকার দিকে ট্রেন যায়। সড়ক পথেও অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। ব্রহ্মপুত্রের ওপরে একটি সেতু থাকলে রংপুর বিভাগের যাত্রীদের ঢাকা যাওয়ার কথা চিলমারী-সুন্দরগঞ্জ-ফুলছড়ি এর কোন একটি উপজেলার ওপর দিয়ে নির্মিত সেতু দিয়ে। সেটি করা হয়নি। এই সেতু স্থাপন করলেই এই উদ্ভট, হাস্যকর, অযৌক্তিক পথ পরিহার করা সম্ভব ছিল।
রংপুরের সাথে ঢাকার যে সড়ক যোগাযোগ তাও কেবল ঢাকা যাওয়ার জন্য গড়ে ওঠেনি। যেহেতু যমুনা সেতু দিয়ে ঢাকা যেতে হবে তাই অন্তত ১শ কিলোমিটার ঘুরে রংপুরের মানুষকে ঢাকা যেতে হয়। যদি চিলমারী-সুন্দরগঞ্জ-ফুলছড়ি এর মধ্যে সুবিধাজনক উপজেলা দিয়ে দ্বিতীয় যমুনা সেতু/ব্রহ্মপুত্র সেতু তৈরি করা যায়, তাহলে রংপুর বিভাগের মানুষ প্রথমবারের মতো যথার্থই ঢাকা যাওয়ার সড়ক পাবে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে যমুনা নদীতে আরেকটি সেতু স্থাপনের কথা শুনছি। এই সেতু নাকি বগুড়ার- সারিয়াকান্দি উপজেলা দিয়ে করা হবে। এটি করলে অসুবিধা নেই। কিন্তু অগ্রাধিকার এবং চাহিদাভিত্তিক করতে হলে দ্বিতীয় সেতু অবশ্যই চিলমারী-সুন্দরগঞ্জ-ফুলছড়ি এর যে কোন উপজেলাতেই হতে হবে। তৃতীয় সেতু হতে পারে বগুড়ার- সারিয়াকান্দি উপজেলা দিয়ে।
দেশে সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প গ্রহণ করা একটি আদর্শ রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম সূচকও বটে। তাই আমরা চাই, বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব বিভাগের মানুষের কথা ভেবে দ্বিতীয় যমুনা/ব্রহ্মপুত্র সেতু চিলমারী-সুন্দরগঞ্জ- ফুলছড়ির সুবিধাজনক স্থানে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
* লেখক, নদী গবেষক ও সংগঠক।