দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেন, কোথায় স্থাপন যৌক্তিক?

রংপুর বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণের ব্যয়, পরিবেশগত সুরক্ষা, দূরত্বগত সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের স্থান গাইবান্ধা জেলার বালাসী বা ফুলছড়ি নির্ধারণ করাই যৌক্তিক হবে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেন, কোথায় স্থাপন যৌক্তিক?

জহুরুল কাইয়ুম :

উৎপত্তিস্থলের বিবেচনায় যমুনা প্রকৃতপক্ষে গাইবান্ধা এলাকার নদী। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীর একটি হয়ে যায় এই যমুনা। হিমালয় পর্বতের কৈলাস শৃঙ্গের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয় ব্রহ্মপুত্র নদ। ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ী থানা অতিক্রম করে এই নদ বাংলাদেশের রংপুর জেলার কুড়িগ্রাম মহকুমার নাগেশ্বরী থানার ধানী রামপুরে প্রবেশ করে। ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের প্রবল বন্যার কারণে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহ জিনাই ও কোনাই নদীখাতে গতি পরিবর্তন করে। আদি ব্রহ্মপুত্রের পূর্বমুখী মোড়ের দক্ষিণে ফুলছড়ির উজানে ব্রহ্মপুত্রের এই নতুন খাত যমুনা নাম ধারণ করে। পরবর্তীতে যমুনা নদী সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামের মধ্য দিয়ে বগুড়া জেলা হয়ে সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার সীমানা অতিক্রম করে গোয়ালন্দের উজানে পদ্মা নদীতে পতিত হয়েছে। যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য ২০৫ কিলোমিটার, প্রস্থ স্থানভেদে ৮ থেকে ১৩ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ১০ কিলোমিটার। যমুনার রয়েছে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা আর শত শত বালুচর। নদীভাঙ্গনে বিপর্যস্ত যমুনা তীরবর্তী মানুষ।

বর্তমানে যমুনা নদীর উপর পূর্বে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর ও পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ জেলা যুক্ত করে একটি সেতু রয়েছে। এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৪.৮ কি.মি. এবং প্রস্থ ১৮.৫ মিটার। সেতুটি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলের সড়ক ও রেলপথকে সুগম করেছে। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। একসময় সড়ক ও রেলপথ একই সেতুতে চালু থাকলেও বর্তমানে পৃথক রেলসেতু চালু হয়েছে। এই সেতুতে ক্রমাগত যানবাহন চলাচলের চাপ বেড়েই চলেছে। বাস্তবতা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মাষ্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে সেতুর জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ইতোমধ্যে দুটো রুটকে প্রধান বিবেচনায় নিয়ে সেতুটি নির্মাণের সঠিক স্থান নির্ধারণের জন্য সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। একটি গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত, আরেকটি বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার মধ্যে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা সামান্যই। তারা মনে করেন, সেতুটি নির্মাণে যেন কোনো এলাকা প্রীতি বা ভোটের রাজনীতি কাজ না করে। বরং আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশ, পরিবেশগত বিবেচনা, নির্মাণ ব্যয়, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে যেন দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়। সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়নের বিষয়টি নির্ভর করবে অনুন্নত ও অবহেলিত অঞ্চলকে অর্থনৈতিক উন্নয়নধারায় যুক্ত করা। দ্বিতীয় যমুনা সেতুটি যেন মানুষের সেই আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের কারণ বিবেচনা করলে প্রথমেই বিবেচনায় আসবে, বিদ্যমান যমুনা সেতুর উপর দিয়ে বর্তমানে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি যানবাহন চলাচল করে। রাজশাহী, রংপুর বিভাগ ছাড়াও খুলনা বিভাগের কিছু অংশের যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করে। ফলে সেতুটি এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায়শই যানজট দেখা দেয়। আবার কখনও দুর্ঘটনাও ঘটে। আবার রংপুর বিভাগের ৮টি জেলা ও তিনটি স্থলবন্দরের সাথে এই সেতুর দূরত্বও অনেক বেশি। এতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, আর রংপুর বিভাগের জেলাগুলোকে দেশের অর্থনীতির মূলধারার সমান্তরালে আনা যাচ্ছে না। তাহলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের স্থান নির্ধারণের উপরিউক্ত বিষয়গুলো গভীর বিবেচনায় নিতে হবে।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট থেকে জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদঘাট রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু স্থাপনের পক্ষে সহজ যুক্তিগুলো হচ্ছে-

ক. বালাসী-বাহাদুরাবাদ বা ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদঘাট ঐতিহাসিকভাবে     নৌ-যোগাযোগের একটি অন্যতম পথ ছিল। রুট দুটিতেই রেল ফেরি চলাচল করত। দুই পাড়েই আগে থেকেই রেললাইনের সংযোগ এবং অবকাঠামো আছে। সেজন্য রেললাইন বা সংযোগ সড়ক নির্মাণের ব্যয় তুলনামূলক কম হবে।

খ. এই সেতু নির্মিত হলে রংপুর বিভাগের সাথে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

গ. দ্বিতীয় যমুনা সেতু এখানে স্থাপিত হলে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিশাল চরাঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে। শিল্পকারখানা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে এ অঞ্চলের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বৃদ্ধি হবে।

ঘ. যমুনা নদীর গতিপথ নদী শাসনের মাধ্যমে সংকুচিত করা গেলে সেতুটির দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে। তাহলে নির্মাণ সময় ও ব্যয় দুটোই কমে যাবে।

ঙ. অর্থনৈতিক দিক থেকে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়া রংপুর বিভাগের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর দ্বিতীয় যমুনা সেতু গাইবান্ধার বালাসী কিংবা ফুলছড়িতে নির্মিত হলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য দুটি স্থান- গাইবান্ধার বালাসীঘাট বা ফুলছড়ি ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদঘাট এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ করিডোরের মধ্যে দূরত্বগত বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি। বালাসী থেকে ১০ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত ফুলছড়ি, সেতু নির্মিত হলে সবকিছু একইরকম হবে। ফুলছড়ি থেকে ৩৫ কি.মি. দূরে সারিয়াকান্দি। আর সারিয়াকান্দি থেকে বর্তমান যমুনা সেতুর দূরত্ব ৬৫ কি.মি.। সেতু নির্মাণ হলে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়। বর্তমান যমুনা সেতুর দুইপাশে জেগে ওঠা চরগুলো সেটার বাস্তব প্রমাণ। সারিয়াকান্দিতে আরেকটি সেতু নির্মাণ হলে যমুনা নদীর প্রবাহ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর এটা যদি উজানে ১০০ কি.মি. দূরত্বে ফুলছড়ি বা বালাসীতে হয় তবে সেই ঝুঁকি কিছুটা কমবে এবং পরিবেশগত ক্ষতিও হ্রাস পাবে। আবার বর্তমান যমুনা সেতু এবং সারিয়াকান্দি পয়েন্ট থেকে রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর দূরত্ব বালাসী ঘাটের তুলনায় অনেক বেশি।

নিচের দূরত্ব ছকটিতে তা স্পষ্ট হবে :

রংপুর বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন, সেতু নির্মাণের ব্যয়, পরিবেশগত সুরক্ষা, দূরত্বগত সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিবেচনা করলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের স্থান গাইবান্ধা জেলার বালাসী বা ফুলছড়ি নির্ধারণ করাই যৌক্তিক হবে।

* লেখক ও গবেষক।