নদীর দুই পাড়ে একটি সেতুর অপেক্ষা
বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ- এই দুই তীরের মানুষের অপেক্ষা তাই শেষ হোক। যমুনার বুকের ওপর উঠুক এমন একটি সেতু, যার ওপর দিয়ে শুধু গাড়ি চলবে না- চলবে উত্তরাঞ্চলের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর নতুন দিনের গল্পগাঁথা।
জুলফিকার চঞ্চল :
একজন নাট্যকার, একজন নাট্যনির্দেশক হিসেবে আমি নদীকে শুধু পানি হিসেবে দেখি না- নদী আমার কাছে একটি সচল চরিত্র। তার আছে স্মৃতি, আছে কান্না, আছে মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার ক্ষমতা। আর সেই নদীর বুক চিরে যখন মানুষ প্রতিদিন পারাপার হয়, তখন মনে হয়- একটি সেতু শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়, এটি মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে মানুষের বাস্তবতার সংযোগ।
গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবি তাই আমার কাছে কোনো জেলার দাবি নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। আজও উত্তরাঞ্চলের মানুষকে রাজধানী কিংবা দেশের পূর্বাঞ্চলে যেতে বড় একটি পথ ঘুরতে হয়। অথচ বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ- দুই তীর যেন চোখের সামনেই। মাঝখানে শুধু যমুনার বিশাল জলরাশি। নদীটি যেন প্রতিদিন মানুষকে প্রশ্ন করে- “তোমরা এত কাছে থেকেও এত দূরে কেন?”
একজন নাট্যকার বা নির্দেশক হিসেবে এই দৃশ্যকে আমি মঞ্চে বা আসরে তুলে ধরতাম-
মঞ্চের এক পাশে গাইবান্ধার কৃষক। তার হাতে উত্তরাঞ্চলের ফসল- আলু, ভুট্টা, ধান, সবজি কিংবা অন্য কৃষিপণ্য। অন্য পাশে জামালপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও পূর্বাঞ্চলের বাজার। কৃষক পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে যমুনা। নদী বলছে- ‘এসো, পার হও।’
কিন্তু পথ দীর্ঘ, পরিবহন ব্যয় বেশি, সময় বেশি। তারপর মঞ্চে প্রবেশ করে একটি সেতু। সেতুটি শুধু দুই পাড়কে যুক্ত করে না- যুক্ত করে বাজারকে, মানুষকে, অর্থনীতিকে, সংস্কৃতিকে, সর্বোপরি সম্ভাবনাকে।
বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু হলে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগের একটি নতুন দরজা খুলতে পারে। উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য দ্রুত পৌঁছাতে পারে ময়মনসিংহ, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চলের বড় বাজারে। আবার সিলেট ও পূর্বাঞ্চলের যে-সব পণ্য উত্তরাঞ্চলে বেশি পরিমাণে আসে, সেগুলোর পরিবহণও সহজ হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, সেতুটি শুধু দূরত্ব কমাবে না- মানুষের সময়ের মূল্য বাড়াবে।
একজন রোগীকে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়। একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়। একজন ব্যবসায়ীকে পণ্য নিয়ে যেতে হয়। একজন কৃষককে তার উৎপাদনের ন্যায্য বাজার খুঁজতে হয়। প্রত্যেকের জীবনেই সময়ের মূল্য আছে। একটি সেতু সেই সময়ের অপচয় কমাতে পারে।
নাটকের শেষ দৃশ্যে আমি হয়তো দেখাব- এক বৃদ্ধ যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সারাজীবন নৌকায় নদী পার হয়েছেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে তার নাতি। দূরে নির্মিত হচ্ছে বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতু।
নাতি প্রশ্ন করে-
‘দাদু, এই নদী কি এতদিন আমাদের আলাদা করে রেখেছিল?’
বৃদ্ধ একটু হাসেন, বলেন-
‘নদী আমাদের আলাদা করেনি রে..., আমাদের পথটা আলাদা করে রেখেছিল।’ সেতু সেই পথটাকেই এক করবে।
তাই বালাসী-বাহাদুরাবাদ দ্বিতীয় যমুনা সেতু আমার কাছে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের নতুন গল্প লেখার সুযোগ। যে গল্পে নদী থাকবে, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা থাকবে না; দূরত্ব থাকবে, কিন্তু সেই দূরত্ব পেরোনোর পথও থাকবে।
একটি সেতু কখনো শুধু দুই তীরকে যুক্ত করে না- একটি সেতু ভবিষ্যৎকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে।
বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ- এই দুই তীরের মানুষের অপেক্ষা তাই শেষ হোক। যমুনার বুকের ওপর উঠুক এমন একটি সেতু, যার ওপর দিয়ে শুধু গাড়ি চলবে না- চলবে উত্তরাঞ্চলের স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর নতুন দিনের গল্পগাঁথা।
* অভিনয়শিল্পী, নাট্যসংগঠক ও নির্দেশক।