দ্বিতীয় যমুনা সেতু: বালাসীঘাট কি হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর?
দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু শুধু আরেকটি নদী পারাপারের অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মানচিত্র পুনর্বিন্যাসের একটি বড় সুযোগ। আমরা বালাসীঘাটের পক্ষে আবেগনির্ভর কোনো সিদ্ধান্ত চাই না। বরং চাই বালাসীঘাটসহ সব সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্টের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তুলনামূলক মূল্যায়ন।
এম. আবদুস্ সালাম :
বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে কিছু অবকাঠামো প্রকল্প শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটায়নি, দেশের অর্থনৈতিক ভূগোলও বদলে দিয়েছে। যমুনা বহুমুখী সেতু দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলকে একসূত্রে যুক্ত করে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
এখন বাংলাদেশের সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত- দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু। প্রশ্ন শুধু আরেকটি সেতু নির্মাণের নয়; বড় প্রশ্ন হলো, সেতুটি কোথায় নির্মিত হলে সর্বাধিক মানুষ উপকৃত হবে এবং আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্থানীয় আবেগ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা কোনো এলাকার আন্দোলনের শক্তির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ দ্বিতীয় যমুনা সেতু কোনো একটি জেলার প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যোগাযোগ, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়নের অন্যতম কৌশলগত বিনিয়োগ।
বর্তমানে সরকারও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্ট নিয়ে সমীক্ষা করছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় গাইবান্ধার বালাসীঘাট ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, বগুড়া-জামালপুরসহ একাধিক সম্ভাব্য করিডোর বিবেচনায় রয়েছে। ফলে এখনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়- কোনো পূর্বনির্ধারিত অবস্থান নয়, বরং তথ্য, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সর্বোত্তম স্থানটি নির্বাচন করা।
সর্বাধিক মানুষের কল্যাণ হোক প্রধান বিবেচনা
বড় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত- একই বিনিয়োগের মাধ্যমে কত মানুষ এবং কত বড় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করা সম্ভব? এই বিবেচনায় গাইবান্ধার বালাসীঘাট বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সম্ভাব্য যোগাযোগ নেটওয়ার্ক বিবেচনায় বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে রংপুর বিভাগের আট জেলা- গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের পাশাপাশি রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সুফল পেতে পারেন।
অর্থাৎ, মোট ১১টি জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডোর তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাব্য সুবিধা অবশ্যই একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় সেতু মানে শুধু আরেকটি সেতু নয়
দ্বিতীয় যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্নটি হলো- আমরা কি শুধু বিদ্যমান যমুনা করিডোরের চাপ কমাতে চাই, নাকি একই বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের জন্য আরেকটি নতুন পূর্ব-পশ্চিম অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করতে চাই?
বর্তমানে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ বিদ্যমান যমুনা সেতুকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সেতু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান যমুনা সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২২ থেকে ২৩ হাজার যানবাহন চলাচল করছে এবং এই সংখ্যা বাড়ছে। চার লেনের সেতুটিতে বিভিন্ন সময়ে যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে।
অতএব, বিকল্প একটি যমুনা ক্রসিংয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন থাকার কথা নয়। কিন্তু দ্বিতীয় সেতুটি যদি বিদ্যমান সেতুর কাছাকাছি একই যোগাযোগ বলয়ের মধ্যে নির্মিত হয়, তাহলে সেটি মূলত বর্তমান করিডোরের সক্ষমতা বাড়াবে। পক্ষান্তরে বালাসীঘাটের মতো ভিন্ন অক্ষ বরাবর সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি নতুন East–West Connectivity Corridor তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি নতুন করিডোর শুধু যানজট কমায় না; এটি নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ, নতুন শিল্পাঞ্চল এবং নতুন শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিকম্প, বড় দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগে একটি প্রধান যোগাযোগ অক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিকল্প করিডোর জাতীয় অর্থনীতির জন্য বাড়তি নিরাপত্তা তৈরি করে।
বালাসীঘাটের রয়েছে ঐতিহাসিক যোগাযোগ-ঐতিহ্য
বালাসীঘাটকে ঘিরে সেতুর চিন্তা একেবারে নতুন নয়। যমুনা সেতু নির্মাণের আগে বালাসী ছিল উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেল ও ফেরি যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ। বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুট দিয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
সরকারও অতীতে বালাসী ও বাহাদুরাবাদে ফেরিঘাট ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। ফলে এই এলাকাকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক সড়ক-রেল-লজিস্টিকস করিডোর গড়ে তোলার সম্ভাবনা নতুন করে মূল্যায়নের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।
আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করলেও সব অঞ্চল সমানভাবে সেই উন্নয়নের সুফল পায়নি। বিশেষ করে রংপুর বিভাগসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগ, মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের সুযোগ এখনও তুলনামূলক সীমিত।
অবকাঠামো শুধু মানুষের যাতায়াত সহজ করে না- অবকাঠামো বিনিয়োগের ভূগোলও বদলে দেয়।
ভালো যোগাযোগ তৈরি হলে শিল্পোদ্যোক্তা নতুন জায়গায় কারখানা স্থাপনের কথা ভাবেন, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়, জমির অর্থনৈতিক ব্যবহার বদলায়, নতুন ব্যাবসাকেন্দ্র তৈরি হয় এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বিতীয় যমুনা সেতুকে শুধু একটি Transport Project হিসেবে না দেখে Regional Development Project হিসেবেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে Agro-industrial Economy
উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য উৎপাদন অঞ্চল। ধান, আলু, ভুট্টা, গম, শাকসবজি, মাছ, দুধ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে এ অঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কৃষকের আয় শুধু উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। পণ্য কত দ্রুত এবং কত কম খরচে বাজারে পৌঁছানো যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত যোগাযোগ তৈরি হলে কৃষিপণ্য দ্রুত ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় বাজারে পৌঁছাতে পারবে। পরিবহন ব্যয় ও সময় কমতে পারে, পচনশীল পণ্যের ক্ষতি হ্রাস পেতে পারে এবং কৃষক ভালো মূল্য পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এর সঙ্গে যদি পরিকল্পিতভাবে agro-processing industry, cold chain, warehouse, logistics hub, SME cluster এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা যায়, তাহলে দ্বিতীয় যমুনা সেতু উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে একটি Agro-industrial Economy-তে রূপান্তরের অনুঘটক হতে পারে।
শুধু বর্তমান যানবাহন দিয়ে ভবিষ্যতের সেতু বিচার করা ঠিক হবে না। সেতুর স্থান নির্বাচনের সময় বর্তমান Traffic Volume অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। কারণ উন্নয়নবঞ্চিত অঞ্চলে বর্তমানে যানবাহন ও শিল্পকারখানা কম থাকাই স্বাভাবিক। শুধু বর্তমান ট্রাফিকের ভিত্তিতে বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো কখনোই অগ্রাধিকার পাবে না।
তাই সমীক্ষায় existing traffic-এর পাশাপাশি future demand, induced demand এবং development potential বিবেচনায় নিতে হবে।অর্থাৎ প্রশ্ন করতে হবে- সেতুটি নির্মিত হওয়ার পর কত নতুন ব্যাবসা সৃষ্টি হবে, কত নতুন বিনিয়োগ আসবে, কত নতুন যানবাহন চলবে এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা সম্প্রসারিত হবে?
আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও দেখতে হবে
বাংলাদেশের আগামী দিনের যোগাযোগ পরিকল্পনা শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারকে কেন্দ্র করে হওয়া যথেষ্ট নয়। উত্তরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণের সময় Regional Trade, Border Connectivity এবং Sub-regional Economic Cooperation-এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
আজ যে সেতু নির্মিত হবে, সেটি হয়তো আগামী একশ বছর ব্যবহৃত হবে। ফলে আজকের প্রয়োজনের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে।
জলবায়ু ও নদীর পরিবর্তনশীল চরিত্র
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বিশ্বের অন্যতম গতিশীল নদী ব্যবস্থা। নদীভাঙন, চর সৃষ্টি, পলি জমা এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন এখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে বন্যা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্মাণ ব্যয় ও দূরত্বের পাশাপাশি River Morphology, Flood Hydrology, Climate Risk এবং Disaster Resilience- এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।একটি শতবর্ষী অবকাঠামোর সিদ্ধান্তও শতবর্ষের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই নিতে হবে।
আন্দোলনের শক্তি নয়, তথ্যের শক্তি
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নিয়ে বিভিন্ন এলাকার মানুষের দাবি থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। মানুষ তার এলাকার উন্নয়ন চাইবে। কিন্তু একটি মেগা প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ কোনো এলাকার আন্দোলনের তীব্রতা, রাজনৈতিক লবিং কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত- সর্বাধিক জনগোষ্ঠীর উপকার, সময় ও পরিবহন ব্যয় সাশ্রয়, নতুন অর্থনৈতিক করিডোর সৃষ্টির সম্ভাবনা, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, কৃষি ও শিল্পের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্যোগকালীন বিকল্প যোগাযোগ, পরিবেশগত প্রভাব এবং সর্বোপরি জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি Economic and Social Return|
ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হতে পারে কয়েক প্রজন্মকে
মেগা অবকাঠামোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পাঁচ বা দশ বছরের জন্য নয়। একটি বড় সেতু দেশের অর্থনীতি ও জনবসতির বিন্যাসকে ৫০ থেকে ১০০ বছর কিংবা তারও বেশি সময় প্রভাবিত করতে পারে। তাই ভুল স্থানে সেতু নির্মাণের অর্থ শুধু কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ নয়; এর অর্থ হতে পারে নতুন একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির সুযোগ হারানো, শিল্পায়নের সম্ভাবনা নষ্ট করা কিংবা একটি বৃহৎ অঞ্চলকে আরও কয়েক দশক উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে রাখা। আবার সিদ্ধান্ত গ্রহণে অযথা দীর্ঘসূত্রতাও কাম্য নয়। প্রতিটি বছরের বিলম্বের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগও পিছিয়ে যায়।
শেষ কথা
দ্বিতীয় যমুনা (ব্রহ্মপুত্র) সেতু শুধু আরেকটি নদী পারাপারের অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মানচিত্র পুনর্বিন্যাসের একটি বড় সুযোগ। আমরা বালাসীঘাটের পক্ষে আবেগনির্ভর কোনো সিদ্ধান্ত চাই না। বরং চাই বালাসীঘাটসহ সব সম্ভাব্য অ্যালাইনমেন্টের স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তুলনামূলক মূল্যায়ন।
একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে, বালাসীঘাটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে রংপুর বিভাগের আটটি এবং রাজশাহী বিভাগের তিনটিসহ মোট ১১টি জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য অধিকতর অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে, একটি নতুন জাতীয় যোগাযোগ করিডোর গড়ে উঠবে, কৃষি ও শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে এবং দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে- তাহলে জাতীয় স্বার্থেই বালাসীঘাটকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে একটি দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
কারণ একটি মেগা সেতুর সফলতা শুধু প্রতিদিন কতটি যানবাহন চলাচল করবে, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে- কত কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সুযোগ বদলাবে, কত নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কত বড় একটি পিছিয়ে থাকা অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হবে। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্থান নির্বাচন তাই আজকের প্রয়োজন মেটানোর সিদ্ধান্ত মাত্র নয়। এটি আগামী ৫০-১০০ বছরের বাংলাদেশের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। সেতু কোথায় হবে- তার উত্তর নির্ধারণ করুক আন্দোলনের শক্তি নয়, তথ্যের শক্তি; আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা নয়, জাতীয় স্বার্থ; আর আজকের হিসাব নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা।
* চর গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।