দ্বিতীয় যমুনা সেতু: আমাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা ও আশপাশের জেলার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি কমে আসবে। যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, কৃষিপণ্য ও সবজি দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাবে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নীলিমা আখতার :
গাইবান্ধার নাম আবারও জাতীয় সংবাদে এসেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের নাম- দ্বিতীয় যমুনা সেতু।
এই প্রকল্প দ্রুত গ্রহণ ও বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে ঢাকা থেকে গাইবান্ধা ও আশপাশের জেলার দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি কমে আসবে। যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, কৃষিপণ্য ও সবজি দ্রুত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাবে, নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি এটি হবে এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ। ইতোমধ্যে জামালপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষ এ সেতুর দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া।
অতীতের যাতায়াতের স্মৃতি
একটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে সড়ক, রেল ও নৌ- এই তিনটি মাধ্যমকেই সমান গুরুত্ব দিতে হয়। একই সঙ্গে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মধ্যে একটি সুষম পরিকল্পনা থাকা জরুরি। উন্নত সড়ক যোগাযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পরিবেশ রক্ষা করে নৌপথ ও রেলপথের যথাযথ ব্যবহারও সমান প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে ছোট ভাই হেদায়েত বাবু একদিন জানতে চাইল, “আপনারা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় কীভাবে যাতায়াত করতেন?” প্রশ্নটি শুনে স্মৃতির দুয়ার খুলে গেল।
গাইবান্ধা স্টেশন থেকে ঠাসাঠাসি ভিড়ের ট্রেনে ওঠা ছিল এক রকম যুদ্ধ। টিকিট কাটা থাকলেও সংরক্ষিত আসন পাওয়া যেত না। কখনো অনুরোধ, কখনো দৈহিক শক্তি দেখিয়ে আসন উদ্ধার করতে হতো। ট্রেন ফুলছড়ি তিস্তামুখ ঘাটে এসে থামত। সেখান থেকে স্টিমারে যমুনা নদী পার হয়ে পৌঁছাতে হতো বাহাদুরাবাদ ঘাটে। অন্য পারে অপেক্ষমাণ ট্রেনে ওঠার জন্য যাত্রীরা দৌড়ে ছুটতেন। ট্রেন ছাড়তে দেরি হলে ঘাটের ছোট ছোট ভাতের হোটেলে ঢুকে গরম ভাত, নদীর মাছ, চিংড়ি, ডিম, ডাল আর লাল ঝোলের তরকারি খাওয়ার যে স্বাদ, তা আজও ভোলা যায় না।
বাসে ঢাকায় আসার অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। তখন সরাসরি বাস চলাচল ছিল না। নগরবাড়ী ঘাটে ফেরিতে উঠতে হতো এবং আরিচা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১৪-১৫ ঘণ্টা লেগে যেত।
যমুনা সেতু : এক যুগান্তকারী পরিবর্তন
আমাদের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার কয়েক বছর পর, ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু চালু হলো। সেতু নির্মাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য ট্রেন ও সিনেমার টিকিটের ওপর বিশেষ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছিল। ছাত্রজীবনে প্রতিবার যাতায়াতে চার টাকা অতিরিক্ত দিতে হতো। আজকের হিসাবে সেই অর্থ খুব সামান্য মনে হলেও তখন একজন শিক্ষার্থীর জন্য সেটি ছিল উল্লেখযোগ্য।
আমার মেয়ের তখন মাত্র এক বছর বয়স। আমার কর্মস্থল ছিল জামালপুর। একবার দেওয়ানগঞ্জ হয়ে ফেরিতে যাত্রাকালে দীর্ঘ সময় আটকে পড়তে হয়। গভীর রাতে ফেরির খোলা ডেকে বিছানার চাদর দিয়ে তাকে ঢেকে রেখেছিলাম। শেষ রাতে এক কনস্টেবল আমাকে চিনে ফেললেন। তিনি বললেন, “স্যার, আগে পরিচয় দেননি কেন? সারারাত বাচ্চাকে নিয়ে কত কষ্ট করলেন!”
সেই সময় বালাসী রুটের একটি সেতুর কথা প্রায়ই শুনতাম। মনে হতো, যদি দেওয়ানগঞ্জ-বালাসী সেতু হতো, তবে কত মানুষের দুর্ভোগ কমে যেত।
যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর দেশের মানুষ এক নতুন সম্ভাবনার স্বাদ পেয়েছিল। বাস যখন যমুনা সেতুর কাছে পৌঁছাত, আমরা সহযাত্রীদের ডেকে বলতাম- “এই দেখ এই দেখ যমুনা সেতু!” বাপরে কত লম্বা! চার কিলোমিটারের সেই সেতু ছিল আমাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক। ১১-১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা নেমে এসেছিল ৬-৮ ঘণ্টায়। দেশের মানুষ তখন সত্যিই আনন্দিত হয়েছিল।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও যমুনা সেতু
সেতুর মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক দূরত্ব কমানো। কৃষক যাতে সহজে বাজারে পৌঁছাতে পারে, তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়- এটাই ছিল প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যানজট, সড়কের অব্যবস্থাপনা, চাঁদাবাজি, জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য সমস্যার কারণে পরিবহন ব্যয় এখনো অনেক ক্ষেত্রে বেশি।
আমার নানা বাড়ি নীলফামারীর গ্রামে আমার মামাতো ভাই ফারুক করলা চাষ করে। তার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ঢাকায় আমরা যে করলা ১০০-১২০ টাকা কেজি দামে কিনি, ফারুক তার নিজের ক্ষেতের সেই করলা মাত্র ১০-১১ টাকা কেজি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ সেতু নির্মাণের পাশাপাশি কার্যকর বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে কৃষকের প্রকৃত লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু : গাইবান্ধার নতুন সম্ভাবনা
গাইবান্ধা জেলা সড়ক, রেল ও নৌ- তিন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেই অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। উত্তরে কুড়িগ্রাম ও রংপুর, দক্ষিণে বগুড়া ও জয়পুরহাট, পূর্বে জামালপুর এবং পশ্চিমে রংপুর, দিনাজপুর ও জয়পুরহাটের সঙ্গে এ জেলার সংযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে গাইবান্ধার পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যমুনা সেতুর ওপর চাপ কমবে, কৃষি ও শিল্পের প্রসার ঘটবে এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তবে উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের পরিবেশের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গাইবান্ধার নদীগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এগুলো এ অঞ্চলের জীবন, জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। নৌপথের গুরুত্ব যেন কমে না যায়, নদীর নাব্যতা যেন বজায় থাকে এবং জেলেদের জীবিকা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়- এই বিষয়গুলোও সমানভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
উপসংহার
দ্বিতীয় যমুনা সেতু শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং সমন্বিত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সেতু নির্মাণের পাশাপাশি সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আঞ্চলিক শিল্পায়নের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই এই সেতু প্রকৃত অর্থে উত্তরবঙ্গের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকাণ্ড ফ্রেমওয়ার্ক-এর মধ্যে এনে মনিটর করতে হবে। ২০৩৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে এখনই ফিজিবিলিটি সংশ্লিষ্ট কাজগুলি শুরু করা দরকার। সেগুলির যথাযথ পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং দরকার। মাননীয় সংসদ সদস্যগণ এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন।
* সাবেক অতিরিক্ত সচিব।