রাষ্ট্রীয় নিয়মাবলী বনাম রাজনৈতিক বক্তব্য: দ্বিতীয় যমুনা সেতুর রুট ঘোষণা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা

একটি মেগা সেতু কোনো নির্দিষ্ট সংসদীয় আসন বা প্রতিমন্ত্রীর এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তৈরি হয় না। সেতু তৈরি হয় দেশের কোটি মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে।

রাষ্ট্রীয় নিয়মাবলী বনাম রাজনৈতিক বক্তব্য: দ্বিতীয় যমুনা সেতুর রুট ঘোষণা নিয়ে স্পষ্ট বার্তা

ইঞ্জি. হাফিজুর রহমান বাবু :

সম্প্রতি বগুড়ার সারিয়াকান্দি-জামালপুরের মাদারগঞ্জ নৌরুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের বিষয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাহেবের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সাধারণ জনগণের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- একজন প্রতিমন্ত্রী কি এককভাবে কোনো মেগা প্রজেক্টের রুট বা স্থান নির্ধারণ করতে পারেন?

একজন প্রকৌশলী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে এর স্পষ্ট, কারিগরি ও আইনি ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো :

১. প্রতিমন্ত্রী বা কোনো ব্যক্তি এককভাবে রুট নির্ধারণের এখতিয়ার রাখেন না

একটি জাতীয় মেগা প্রজেক্ট বা দ্বিতীয় যমুনা সেতুর মতো হাজার হাজার কোটি টাকার কাঠামোগত প্রকল্প কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পছন্দ, রাজনৈতিক কার্যালয় বা মৌখিক নির্দেশনায় চূড়ান্ত হয় না। রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী, যে-কোনো মেগা প্রজেক্টের রুট নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার হলো পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (ECNEC) এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কারিগরি দলের (Engineers & Hydrologists)। কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অনুরোধ করা একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই চূড়ান্ত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নয়।

২. কারিগরি ও ফিজিবিলিটি স্টাডির গুরুত্ব

যেখানে নিরপেক্ষ প্রকৌশলগত সার্ভে (Hydrological & Geotechnical Feasibility Studz) সম্পন্ন হয়নি, সেখানে ভিত্তিহীন আশ্বাস দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থী। যমুনা নদীর জটিল প্রবাহ, নদী শাসন খরচ এবং জাতীয় রেল সংযোগের উপযোগিতা বিবেচনা না করে কোনো কাল্পনিক পয়েন্টে সেতু নির্মাণের ঘোষণা কেবলই অবাস্তব রাজনৈতিক আবেগ। বিপরীতে, ‘তিস্তামুখ ঘাট (ফুলছড়ি)-বাহাদুরাবাদঘাট (দেওয়ানগঞ্জ)’ রুটটি বোনারপাড়া রেলওয়ে জংশন ও আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগের দিক থেকে শতভাগ বাস্তবসম্মত এবং এর কারিগরি উপযোগিতা সুপ্রমাণিত।

৩. চরাঞ্চলের কোটি মানুষের গণদাবি বনাম ব্যক্তি-স্বার্থ

একটি মেগা সেতু কোনো নির্দিষ্ট সংসদীয় আসন বা প্রতিমন্ত্রীর এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য তৈরি হয় না। সেতু তৈরি হয় দেশের কোটি মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে। সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুটের চেয়ে তিস্তামুখ-বাহাদুরাবাদ রুটটি পুরো রংপুর বিভাগ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের দূরত্ব ও সময় সবচেয়ে বেশি সাশ্রয় করবে।

আমাদের স্পষ্ট অবস্থান

আমরা মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই- কারিগরি তথ্য ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষাকে উপেক্ষা করে সস্তা রাজনৈতিক হাততালি পাওয়ার জন্য কোনো অবাস্তব সিদ্ধান্ত দেশের মেগা প্রজেক্টের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। আমরা নিশ্চিত যে, অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার বা কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল কোনো ব্যক্তিগত প্রভাবে প্রলুব্ধ না হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আর সেই নিরপেক্ষ সমীক্ষায় কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ‘তিস্তামুখঘাট-বাহাদুরাবাদঘাট’ রুটটিই যে বিজয়ী হবে, তা আমরা শতভাগ নিশ্চিত। চরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য আন্দোলন কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক মৌখিক আশ্বাসে দমে যাবে না!

* সদস্য সচিব, তিস্তামুখ ঘাট-বাহাদুরাবাদঘাট দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি।