বালাসী-বাহাদুরাবাদ দ্বিতীয় যমুনা সেতু: রংপুর বিভাগের ভাগ্য বদলের অপেক্ষা
দাবি স্পষ্ট- বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও ন্যায্য উন্নয়নের প্রতীক। এই দাবি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে- নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে অবহেলিত এই জনপদ।
ইব্রাহিম আকন্দ সেলিম :
দেশ স্বাধীন হয়েছে পঞ্চান্ন বছর আগে, কিন্তু যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক থেকে রংপুর বিভাগ এখনো রয়ে গেছে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারার বাইরে। এই অবহেলার প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দু গাইবান্ধা জেলা- একটি জেলা যা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হয়ে আছে ‘পকেট শহর’ হিসেবে। এই বাস্তবতা বদলে দিতে পারে একটিমাত্র প্রকল্প- গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদঘাট পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ।
অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস
১৮৫৮ সালে রংপুর জেলার অধীনে ভবানীগঞ্জ নামে যে মহকুমা গঠিত হয়েছিল, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে তা বিলীন হয়ে ১৮৭৫ সালে সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয় বর্তমান গাইবান্ধায়। পরে এরশাদ সরকারের আমলে মহকুমা থেকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তরিত হয় গাইবান্ধা। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- জাতীয় প্রতিটি সংগ্রামে এখানকার মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন কিংবা মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি এই জনপদে। ২৫ লক্ষাধিক মানুষের আবাসস্থল, কৃষিনির্ভর এই জেলা আজও যোগাযোগ-বঞ্চনার শিকার।
সরকার আসে যায়, কিন্তু আমরা যে তিমিরে আছি, সেই তিমিরেই থেকে যাচ্ছি। এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কখনোই এই দাবি নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেননি।
কেন বালাসী-বাহাদুরাবাদ
বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের সব যানবাহন ও রেল যোগাযোগ নির্ভর করে একমাত্র যমুনা সেতুর ওপর, যা তার ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বহুগুণ চাপ বহন করছে। বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত দ্বিতীয় সেতু নির্মিত হলে-
· ঢাকার সঙ্গে রংপুরের আটটি জেলার দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার কমে যাবে;
· প্রথম যমুনা সেতুর ওপর চাপ কমে তার আয়ুষ্কাল বাড়বে;
· কৃষিপণ্য, শাকসবজি ও কুটিরশিল্পজাত পণ্য দ্রুত রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হবে;
· শিল্প-কারখানা স্থাপনের পথ তৈরি হয়ে বেকারত্ব হ্রাস পাবে।
উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশ আমলে তিস্তামুখ ঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেল-সংযুক্ত ফেরি যোগাযোগ চালু ছিল, যা নদীভাঙনে বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি বালাসীঘাটে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফেরি টার্মিনালও নাব্যতা সংকট ও পলি জমার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে। এ থেকে স্পষ্ট, ফেরিঘাট নয়- স্থায়ী সমাধান কেবল একটি সেতুই।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাব ও স্থানীয় আপত্তি
একই সময়ে ফুলছড়িঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুর পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবিও উঠেছে। তবে বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুট সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের উপকারে আসবে, কারণ এই পথে রংপুর বিভাগের সবগুলো জেলার পাশাপাশি বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোরের যোগাযোগও সহজ হবে।
নদীভাঙন রোধ ও পর্যটনের সম্ভাবনা
গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার ভাঙনের শিকার। সেতু নির্মাণের সঙ্গে সমান্তরালে নদীশাসন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলে এই ভাঙন রোধ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী সবুজায়ন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হবে, যা জামালপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার পর্যটন এলাকার সঙ্গে রংপুর অঞ্চলের সংযোগ ঘটাবে।
জাতীয় উন্নয়নে সমতার প্রশ্ন
মূল বক্তব্য হলো- দেশের উন্নয়ন যদি কেবল দক্ষিণাঞ্চলকেন্দ্রিক থেকে যায় এবং উত্তরাঞ্চল উপেক্ষিত থাকে, তাহলে তা আঞ্চলিক বৈষম্যকেই দীর্ঘায়িত করবে। নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধাসহ পুরো রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে এই একটি সেতুর ওপর।
দাবি স্পষ্ট- বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও ন্যায্য উন্নয়নের প্রতীক। এই দাবি এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে- নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে অবহেলিত এই জনপদ।
* শিক্ষক ও সমাজকর্মী।