দ্বিতীয় যমুনা সেতু: ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন- নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, দক্ষ জনবল, বাজারে সহজ প্রবেশ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অন্যতম পূর্বশর্ত। দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নতুন শিল্প ও সেবাখাত বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু: ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনা

দিপঙ্কর সাহা বাপ্পা :

আমরা যখন দ্বিতীয় যমুনা সেতু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছি- তখন আমাদের প্রাণের শহর, ঐতিহ্যের শহর গাইবান্ধা বন্দি হয়ে আছে পকেট শহরে। নৌরুটগুলা বন্ধ হবার পর এক সময়ের নৌযোগাযোগ নির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। জাতীয় মহাসড়ক থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান হবার কারণে পকেট শহরের ব্রাকেটে বন্দি গাইবান্ধার অর্থনীতি। কল-কারখানা নেই, কৃষিনির্ভর অঞ্চল হলেও নেই কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা। ফলে এক সময় দেশ-বিদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর একটি আমাদের গাইবান্ধা এখন অনেক অনেক পিছিয়ে।

অথচ দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো- উৎপাদন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। এই তিনটি ক্ষেত্রের সফলতা নির্ভর করে একটি কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর। সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর- এই চারটি খাত যত সমন্বিত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় তত কমবে এবং অর্থনীতি তত গতিশীল হবে।

উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ী সমাজ দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি- উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে যোগাযোগ ব্যয়। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য, কাঁচামাল কিংবা ভোগ্যপণ্য- সবকিছুর পরিবহন ব্যয় ও সময় ব্যবসার প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করে।

একজন ব্যবসায়ীর জন্য পণ্যের উৎপাদন খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন যানজট হয়, বিকল্প রুট থাকে না, দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়, তখন শুধু পরিবহন ব্যয়ই বাড়ে না, ব্যবসার মূলধনও দীর্ঘসময় আটকে থাকে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে বিকল্প করিডোর সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে পরিবহন ব্যবস্থায় অধিক স্থিতিশীলতা আসতে পারে, যা ব্যবসার জন্য ইতিবাচক হবে।

উত্তরাঞ্চলে বর্তমানে- আলু সংরক্ষণাগার, চালকল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, দুগ্ধশিল্প, ভুট্টাভিত্তিক পশুখাদ্য শিল্প, সবজি ও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগ ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই শিল্পগুলোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ একটি মৌলিক প্রয়োজন। দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত হলে- উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে, বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে, নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হতে পারে, রপ্তানির সুযোগ বাড়তে পারে।

বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী, হিলি ও সোনাহাট স্থলবন্দর উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দরগুলোর সঙ্গে জাতীয় মহাসড়ক ও সম্ভাব্য নতুন যমুনা করিডোরের সমন্বয় ঘটলে- পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বাড়বে, আমদানি-রপ্তানির সময় কমবে, লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস পেতে পারে, আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসতে পারে।

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন- নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, দক্ষ জনবল, বাজারে সহজ প্রবেশ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অন্যতম পূর্বশর্ত। দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নতুন শিল্প ও সেবাখাত বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাষা কেবল আবেগ নয়- দক্ষতা, সময়, ব্যয় ও নির্ভরযোগ্যতা। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য প্রভাবও এই চারটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে। একটি নতুন করিডোর কেবল উত্তরাঞ্চলের ব্যবসাকে নয়, জাতীয় সরবরাহব্যবস্থা, শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যকেও নতুন গতি দিতে পারে।

উন্নত যোগাযোগ মানে শুধু দ্রুত যাত্রা নয়, উন্নত যোগাযোগ মানে দ্রুত বিনিয়োগ, দ্রুত শিল্পায়ন এবং দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

* পরিচালক, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, গাইবান্ধা।