স্বপ্নের দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরবঙ্গের সাথে পূর্ববঙ্গের সরাসরি সংযোগ 

এ সেতু কেবল উত্তরের নয় বরং জাতীয় অর্থনীতিতে বিপ্লব এনে দিতে পারে। চিকিৎসা বিষয়ে ঢাকার সাথে উত্তরের দূরত্ব কমলে মানুষের চিকিৎসাজনিত মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে।

স্বপ্নের দ্বিতীয় যমুনা সেতু: উত্তরবঙ্গের সাথে পূর্ববঙ্গের সরাসরি সংযোগ 

ডা. মুসাভভির রহমান খান রিদিম :

বাংলাদেশের জাতীয় মনোযোগের নামমাত্র জায়গাজুড়ে উত্তরবঙ্গের অবস্থান- বললে অত্যুক্তি হবেনা। বিগত ৫টি বাজেটে জাতীয় এডিপির আকার আড়াই লাখ কোটি থেকে বেড়ে তিন লাখ কোটিতে পৌঁছালেও, রংপুর বিভাগের বরাদ্দের হার ৩.৫% থেকে ৪.১% এর বৃত্তেই আটকে আছে। অথচ জনসংখ্যার অনুপাতে উত্তরবঙ্গ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০.৫% ধারণ করে আছে। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১০.৯৩% যার এক তৃতীয়াংশের জোগান আসে এই বঞ্চিত উত্তরের মেহনতি মানুষের ঘামের বিনিময়ে। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, যোগাযোগ যেন এ অঞ্চলের মানুষের কাছে আকাশের তারা গোনার মতই অহেতুক সময়ের অপচয়। 

উত্তরের বুক চিড়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার স্রোতোধারা বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করতে পারলেও, পারেনি এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে। বরং তাদের আটকে ফেলেছে এক সীমাহীন সীমাবদ্ধতার বেড়াজালে। বালাসী সেতু হয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকা বিভাগের সাথে উত্তরের দূরত্ব ১০০-১৫০ কি.মি. কমানোর স্বপ্নে প্রায় দুই-তিন দশক ধরে বিভোর উত্তরের আটটি জেলার দারিদ্র্যপীড়িত কোটি কোটি জনগণ। 

সরকার আসে যায়। টুক-টাক কাঁচারাস্তা পাকা হয়, বা পাকা রাস্তা আরও পাকা হয়, শুধু হালে পানি পায় না গাইবান্ধার বালাসীঘাটের দ্বিতীয় যমুনা সেতুর স্বপ্নের প্রজেক্টটা। দশকের পর দশক ধরে সেতুটির ঠিকানা কেবল জাতীয় নীতি-নির্ধারকদের কথায় ও খবরের কাগজে। সম্প্রতি জাতীয় বাজেটে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে একটি কৌশলগত ঘোষণা এসেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর বাজেট বক্তব্যে দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ‘দ্বিতীয় যমুনা সেত’ নির্মাণের আনুষ্ঠানিক মহাপরিকল্পনা ও সমীক্ষার (Feasibility Studz)ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণার পর থেকেই নীতি-নির্ধারক, প্রকৌশলী এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটি মৌলিক প্রশ্ন নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে- ঠিক কোথায় নির্মিত হওয়া উচিত যমুনার এই দ্বিতীয় লাইফলাইন? অর্থাৎ সেতুর মৌখিক স্বীকৃতি মিললেও ধোঁয়াশায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে গাইবান্ধায় সেতু হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি। অথচ এ সেতুর জন্য আন্দোলন, দাবি, সংগ্রাম, প্রতীক্ষা সব কিছুর ভিত্তি ছিল গাইবান্ধার বালাসীঘাট-দেওয়ানগঞ্জ রুটকেন্দ্রিক। 

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (BBA) বর্তমানে যে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই পরিচালনা করছে, তাতে মূলত তিনটি রুট রাখা হয়েছে : গাইবান্ধার ফুলছড়ির তিস্তামুখঘাট-জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদঘাট, গাইবান্ধার ফুলছড়ির বালাসীঘাট-জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এবং বগুড়ার সারিয়াকান্দি-জামালপুরের মাদারগঞ্জ। একটি মেগা প্রকল্পের রুট নির্ধারণের ক্ষেত্রে কস্ট-বেনিফিট রেশিও (BCR), ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (EIRR), হাইড্রোলজিক্যাল মরফোলজি এবং ট্রাফিক ফোরকাস্টিংয়ের মতো নিরেট গাণিতিক ও প্রকৌশলগত উপাত্তের বিশ্লেষণ জরুরি। 

রুট বিশ্লেষণ : প্রকৌশল বনাম আঞ্চলিক সমতা

যমুনা নদী প্রতিবছর প্রায় ১.২ বিলিয়ন টন পলি বহন করে। এই নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা মানে প্রকৃতির সবচেয়ে গতিশীল ও অস্থির আচরণের বিরুদ্ধে এক বিশাল প্রকৌশলগত যুদ্ধ। তিনটি প্রস্তাবিত রুটের সামাজিক ও প্রকৌশলগত তথ্য বিশ্লেষণ করলে বাস্তব চিত্রটি পরিষ্কার হয়:

ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ রুট

ঐতিহাসিকভাবে, ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এই রুটে রেল-ফেরি সচল ছিল। ফলে এই রুটের প্রতি দুই পাড়ের মানুষের একটি দীর্ঘদিনের মানসিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ রয়েছে। তবে কারিগরিভাবে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মিলনস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এই পয়েন্টে নদীর তলদেশ এবং নাব্য অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। যমুনার এই অংশে ১৫-১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করতে গেলে মোট বাজেটের প্রায় ৪০% থেকে ৪৫% অর্থ শুধু নদীশাসনেই চলে যাবে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোর (যেমন: বিশ্বব্যাংক বা এডিবি) নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মেগা প্রকল্পের ঊওজজ যদি ন্যূনতম ১২% না হয়, তবে তাতে ঋণ পাওয়া যায় না। ফুলছড়ির েত্রে অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয়ের কারণে এই সূচকটি আনুমানিক ১০% এর কাছাকাছি নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা প্রকল্পটিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। 

সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুট

হাইড্রোলজিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং দিক থেকে এই রুটটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। নদীর চ্যানেল সংকীর্ণ হওয়ায় সেতুর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১২-১৪ কি.মি. এবং নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হতে পারে। তবে এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভূমি অধিগ্রহণ। দুই প্রান্তেই ঘনবসতি এবং উর্বরা তিন-ফসলি জমি থাকায় ৫০০ হেক্টরের বেশি ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে প্রায় ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতে হবে। এতে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, উত্তরবঙ্গের অনগ্রসর জেলাগুলোর ঢাকামুখী দূরত্বের কোনো পরিবর্তন হবে না। 

বালাসীঘাট-দেওয়ানগঞ্জ রুট

কারিগরি, প্রশাসনিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বালাসীঘাট-দেওয়ানগঞ্জ রুটটির কিছু সুনির্দিষ্ট এবং প্রায়োগিক সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, ২০২২ সালে বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA) এখানে প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে যে আধুনিক ফেরি টার্মিনাল, পল্টুন এবং পাকা এক্সেস রোড তৈরি করে   রেখেছিল, সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সেই তৈরি জমি ও সড়কগুলোকে অ্যাপ্রোচ রোড ও টোল প্লাজা হিসেবে সরাসরি পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব। এটি মেগা প্রজেক্টের সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি ধাপ অর্থাৎ নতুন ভূমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতা ও প্রাথমিক খরচকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে (১৫০-২০০ হেক্টর) নামিয়ে আনবে। কম খরচে তৈরি অবকাঠামোর এই সংযোগের ফলেই এর বেনিফিট-কস্ট রেশিও (BCR) ১.৫৮ এর আশেপাশে হবে বলে ধারণা করা যায়, যা আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্তপূরণে অত্যন্ত কার্যকর। 

দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতির পরিভাষায় একটি মেগা প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য থাকে ‘আঞ্চলিক সুষম উন্নয়ন’ বা Regional Equity। এই রুটে সেতু হলে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের মতো তুলনামূলক অনগ্রসর জেলাগুলোর ঢাকার সাথে দূরত্ব প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার কমে যাবে এবং যাতায়াত সময় বাঁচবে অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। 

সামষ্টিক অর্থনীতিতে বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ রুটের প্রভাব

বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ পয়েন্টে টেকসই হাইড্রোলজিক্যাল ড্রেজিং ও আধুনিক নদীশাসন প্রযুক্তির সমন্বয় করা গেলে তা পুরো উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে একটি বড় ইতিবাচক ডাইমেনশন যোগ করবে: 

১. কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলা (স্থলবন্দরের খরচ ও দূরত্বের সাশ্রয়)

কুড়িগ্রামের সোনাহাট এবং লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও ভূটান থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রাকে কয়লা, পাথর ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি হয়। এই করিডোরটি চালু হলে উক্ত দুই জেলার জন্য নিম্নলিখিত সুবিধা নিশ্চিত হবে :

§  দূরত্ব হ্রাস : বর্তমানে এই অঞ্চলের যানবাহনগুলোকে রংপুর-বগুড়া-সিরাজগঞ্জ হয়ে দীর্ঘপথ ঘুরে যমুনা সেতু দিয়ে ঢাকায় আসতে হয়। বালাসীতে সেতু হলে ঢাকার দূরত্ব সরাসরি ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার কমে যাবে।

§  লজিস্টিকস খরচ সাশ্রয় : করিডোর ছোট হওয়ার কারণে পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রাকের লজিস্টিকস ও ফুয়েল খরচ ২৫% থেকে ৩০%  হ্রাস পাবে।

§  সময় সাশ্রয় : ঢাকাগামী যানবাহনের যাতায়াত সময় অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বাঁচবে। 

২. বৃহত্তর রংপুর বিভাগ ( রংপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর)

রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার ঢাকামুখী যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর অল্টারনেটিভ হাইওয়ে করিডোর তৈরি করবে।

·        যমুনা সেতুর ওপর চাপ হ্রাস : রংপুর অঞ্চলের ঢাকামুখী যানবাহনের অন্তত ২৫% থেকে ৩০% গাড়ি যমুনা সেতুর পরিবর্তে বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ রুট ব্যবহার করা শুরু করবে। এর ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দীর্ঘদিনের যানজট চিরতরে নিরসন হবে।

·        আলু ও সবজি চাষীদের আয় বৃদ্ধি : রংপুর ও নীলফামারী অঞ্চলের কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু ও মৌসুমি সবজি দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার এবং চট্টগ্রামে পৌঁছানোর সময় অর্ধেক হয়ে যাবে। ফলে পচনশীল পণ্যের অপচয় ১৫% কমে আসবে এবং কৃষকদের নিট লাভ ২০% বৃদ্ধি পাবে। 

৩. ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও সিলেট বিভাগ (সরাসরি আন্তঃবিভাগীয় সংযোগ)

বর্তমানে উত্তরবঙ্গের কোনো মানুষকে ময়মনসিংহ বা সিলেটে যেতে হলে ঢাকা বা গাজীপুরের চন্দ্রা মোড় হয়ে বিশাল জ্যাম ঠেলে ঘুরে যেতে হয়, যা অত্যন্ত সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ:

ü দূরত্ব ও রুট পরিবর্তন : বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ সেতুটি চালু হলে উত্তরবঙ্গের মানুষ সরাসরি জামালপুর-ময়মনসিংহ হয়ে সিলেটে প্রবেশ করতে পারবে। এতে সিলেট ও ময়মনসিংহের সাথে উত্তরবঙ্গের দূরত্ব ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার কমে যাবে।

ü বাণিজ্যিক করিডোর : সিলেটের পাথর এবং ছাতকের সিমেন্ট সরাসরি যমুনা সেতু পার হয়ে উত্তরবঙ্গের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে। এতে উত্তরবঙ্গে নির্মাণ সামগ্রীর দাম ৮% থেকে ১০% কমবে। 

৪. কৃষি অর্থনীতির রূপান্তর

গাইবান্ধা ও জামালপুরের বিস্তৃত চরাঞ্চল অত্যন্ত উর্বর। এই বেল্টটি দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১৫% লাল মরিচ এবং ২০% ভুট্টা উৎপাদন করে। সেতুটি হলে চরের পণ্য সরাসরি ঢাকার কাওরান বাজারে পৌঁছাবে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে প্রান্তিক কৃষকের আয় ৩০% থেকে ৪০% বৃদ্ধি করতে সক্ষম। 

একটি মেগা প্রকল্পের সাফল্য কেবল তার কংক্রিটের কাঠামো বা কম নির্মাণ ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলছে, তার ওপর নির্ভর করে। এ সেতু কেবল উত্তরের নয় বরং জাতীয় অর্থনীতিতে বিপ্লব এনে দিতে পারে। চিকিৎসা বিষয়ে ঢাকার সাথে উত্তরের দূরত্ব কমলে মানুষের চিকিৎসাজনিত মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমে যাবে। সুতরাং, উত্তরের ৮টি জেলার মানুষদেরকে জাতীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নের আরও কাছাকাছি আনতে গাইবান্ধার বালসীঘাটের সেতু সবচেয়ে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে।

* চিকিৎসক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট।