চিনিকল বন্ধ হলেও থামেনি কৃষক: চরাঞ্চলে গুড় তৈরির মহোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা

চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় আখ চাষ বন্ধ হয়ে গেলেও গাইবান্ধার ফুলছড়ির চরাঞ্চলের কৃষকরা দমে যাননি। আধুনিক কল-কারখানার বিকল্প হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন বাপ-দাদাদের আমলের সেই চিরচেনা দেশীয় পদ্ধতি। যমুনার বুকে জেগে ওঠা দুর্গম চরে এখন দিন-রাত চলছে বিষমুক্ত ও শতভাগ খাঁটি আখের গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ।

কেমিক্যালমুক্ত নিরভেজাল গুড়

বাজারের ভেজাল গুড়ের ভিড়ে ফুলছড়ির চরের এই গুড় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানকার কৃষকদের দাবি- গুড় জমাট বাঁধাতে তারা কোনো ময়দা, আদা, হাইড্রোস বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার করেন না। উদ্যোক্তা কৃষক জানান: "বাজারে অনেক ভেজাল গুড় আছে, কিন্তু আমাদের গুড় একবারে খাঁটি। আমরা কোনো ময়দা বা কেমিক্যাল মেশাই না। যারা আমাদের গুড় একবার কেনেন, তারা দেখেই পছন্দ করেন।"

বাপ-দাদাদের ঐতিহ্য ও কঠোর পরিশ্রম

প্রায় ২৫-৩০ বছর ধরে এই পদ্ধতিতে গুড় তৈরি করছেন স্থানীয় কৃষকরা। এই বিদ্যা তারা পেয়েছেন তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। আখ মাড়াই থেকে শুরু করে গুড় নামানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে চলে হাড়ভাঙা খাটুনি। প্রথমে আখ কেটে পরিষ্কার করে মাড়াইয়ের মাধ্যমে রস বের করা হয়। এরপর বড় চুলায় টানা ৩ ঘণ্টা রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় লালচে সোনালী রঙের সুস্বাদু গুড়।

১০ বিঘায় ২ লাখ টাকা লাভের আশা

চরাঞ্চলের ১০ বিঘা জমিতে আখ চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। কৃষকরা আশা করছেন, উৎপাদিত গুড় বিক্রি করে সব খরচ বাদে তাদের প্রায় ২ লাখ টাকা লাভ থাকবে। বর্তমানে ১০-১২ জন শ্রমিক মিলে প্রতিদিন প্রায় ১০ মণ গুড় উৎপাদন করছেন।

বাজারদর ও চাহিদা

এখানকার গুড় প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সহজলভ্য করার জন্য কৃষকরা ৭০০ গ্রামের ছোট ডালি বা পাটালি ৯০ টাকায় বিক্রি করছেন। স্থানীয় চাহিদার পাশাপাশি এই গুড় বগুড়া, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। এমনকি প্রবাসীরাও এই খাঁটি গুড় বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন।

অবস্থান

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের পূর্ব পাশে যমুনার চরাঞ্চলে এই গুড় তৈরির কার্যক্রম চলছে। যমুনার দুর্গম চরে কৃষকদের এই সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশেও পরিশ্রম আর সততা থাকলে দেশি শিল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।