পড়াশোনা ছেড়ে বিয়ে করাই ছিল ভুল! ১ দিনে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আয়ের অবিশ্বাস্য গল্প।
ভুল
আমার জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত একটাই ছিল—পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রেম করা আর বিয়ে করা। এই সিদ্ধান্তের কারণে আমি পড়াশোনা কমপ্লিট করতে পারিনি। সেখান থেকেই পরে পার্লারের কাজে আসা। তবে আল্লাহর রহমতে আমি সফল হয়েছি। একদিন ঈদের সময় আমি বউ সাজিয়ে একদিনেই ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আয় করেছি। পার্লার দেওয়ার ছয় মাস পর থেকেই আল্লাহর রহমতে সফলতা আসতে শুরু করে। আনুমানিক মাসিক হিসাব করলে ২০–৩০ হাজার টাকার উপরে ইনকাম হয়।
এই কাজটা শুধু মেয়েদের কাজ। এখানে পুরুষের কোনো কাজ নেই। আমরা ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে থেকেই কাজ করি। প্রথমে আমি ৫৫ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে পার্লার শুরু করি। পার্লার দেওয়ার পর থেকে আল্লাহর রহমতে অনেক কিছু করতে পেরেছি।
ছোটবেলা থেকেই আমার পার্লারের কাজ শেখার খুব ইচ্ছা ছিল। আমার মামা-মামির গাইবান্ধার প্রথম পার্লার ছিল। আমার মামী অঙ্গনা পার্লারের মালিক ছিলেন। তার কাছ থেকেই আমি হাতে-কলমে কাজ শিখি। ২০০৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর আমি বসে ছিলাম, ভালো লাগছিল না, কিছু পারিবারিক সমস্যাও ছিল। তখন আমার মামী আমাকে বলেন, কাজটা শিখলে ভবিষ্যতে কিছু করে খেতে পারবে। আমার বাবা তখন অনুমতি দেন এবং বলেন, পড়াশোনা না করলে অন্তত একটা কাজ শিখে রাখো।
যখন আমি পার্লার দেই, তখন তিনতলায় পার্লার ছিল। পাশেই একটি কাপড়ের দোকান ছিল। শুরুতে সবাইকেই একটু স্ট্রাগল করতে হয়। আল্লাহর রহমতে আমার হাতের কাজ ভালো হওয়ায় দ্রুত কাস্টমার পেতে শুরু করি। শুরুতে কাস্টমার আসতে চায় না, টাকার সমস্যাও থাকে। তখন পার্লারের সংখ্যা কম ছিল, জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি ছিল। একটা বেড কিনতেই ২৫–৩০ হাজার টাকা লাগত। পার্লার দিতে গেলে অনেক সময় পাঁচ–ছয় লাখ টাকা লাগত। তখন লোন, ধার করে কাজ শুরু করতে হয়েছে।
এখন পরিস্থিতি অনেক সহজ হয়েছে। জিনিসপত্র সহজে পাওয়া যায়, দামও কমেছে। প্রথম কাজ শেখার সময় আমি মামির কাছেই শিখেছি। আমার বাবার দেওয়া টাকা আর একজন কাস্টমার আপুর সহযোগিতায় পার্লার শুরু করি। পরিবার থেকে ফুল সাপোর্ট পেয়েছি। আমার হাজবেন্ড তখন থেকেই আমাকে সাপোর্ট করে আসছেন। সবাই সবসময় পাশে থেকেছে।
আমরা মনোযোগ দিয়ে কাজ করি, এটাকে শুধু কাজ নয়, সেবা হিসেবে দেখি। আপুরা আমাদের কাছে ভালো সার্ভিস পাওয়ার জন্য আসে। আমরা চেষ্টা করি মন থেকে ভালোবাসা দিয়ে কাজটা সুন্দর করে করার, যেন তারা আবার আমাদের কাছেই আসে।
আমার পার্লারে হাইড্রা ফেসিয়াল, ভ্রু ব্রন্ডিং, তিল ফেসিয়াল, ভ্রু প্লাক, আপার লিপ, পেডিকিউর, ম্যানিকিউর, বডি ম্যাসাজ, রিবন্ডিং, নাক ফোঁটা, কান ফোঁটা—সব ধরনের সার্ভিস আছে। আল্লাহর রহমতে আমার ব্যবহার সবাই পছন্দ করে। বিশেষ করে বউ সাজ, ভ্রু প্লাক আর ফেসিয়াল—এই তিনটা কাজ আমার হাতে সবাই বেশি পছন্দ করে। অনেক কাস্টমার আমার মেয়েদের হাতেও কাজ নিতে চায় না, আমার কাছেই নিতে চায়।
পার্লার দেওয়ার ছয় মাস পর থেকেই আমি সফলতা পেয়েছি। কাস্টমাররা আমাকে যেভাবে ভালোবাসে, তাতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয় না। আল্লাহর রহমতে এখন কাস্টমার আমাকে খুঁজে নেয়। মাসিক হিসাব আনুমানিক ২০–৩০ হাজার টাকার বেশি হয়।
আমি যখন আনম্যারিড ছিলাম, তখন থেকেই পার্লারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমার হাজবেন্ড তখন থেকেই আমাকে সব কাজে সাপোর্ট করে আসছেন। আমি কোথাও বউ সাজাতে গেলে সে আমাকে নিয়ে যায়, আবার নিয়ে আসে। খুব ভোরে কাজ থাকলেও সে পাশে থাকে। কখনো আমাকে একা ছাড়ে না, কোনো কাজে বাধা দেয়নি।
ভবিষ্যতে আরও বড় করার ইচ্ছা আছে। আল্লাহ যদি সহায় হন, দেশ ও সময় ভালো থাকে, তাহলে আরও সামনে এগোবো। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে এনজিও থেকে সহায়তা পেয়েছি, ব্যাংক থেকেও সহযোগিতার কথা শোনা যাচ্ছে। এই কাজ আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে—মানুষের ব্যবহার, ভালো-মন্দ সবকিছু।
এই পথে আসতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কেউ ভালোবাসা দিয়েছে, কেউ বদনাম করেছে, কেউ অন্য পার্লারের সঙ্গে ঝামেলা লাগানোর চেষ্টা করেছে। ভালো আর খারাপ—দুটো দিক থেকেই শিক্ষা পেয়েছি।
আবারও বলি, আমার জীবনের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রেম আর বিয়ে করা। তবে আল্লাহর রহমতে এখন ভালো আছি। আমার হাত ধরে যারা কাজ শিখেছে, তাদের অনেকেই এখন নিজের পার্লার চালাচ্ছে। একজন ছাত্রী আমার নাম ব্যবহার করেই পার্লার চালাচ্ছে—এটা আমার জন্য গর্বের।
সব আপুদের জন্য আমার পরামর্শ—যারা চাকরি করতে চান না, বাসায় বসে বোর লাগছে, সবসময় হাজবেন্ডের কাছে হাত পাততে ভালো লাগে না—তারা অবশ্যই পার্লারের কাজ শিখুন। নিজের পায়ে দাঁড়ান, স্বাবলম্বী হন।
পার্লার দেওয়ার পর থেকে আল্লাহর রহমতে আমি অনেক কিছু করেছি। ভবিষ্যতে নিজের জন্য, বাচ্চাদের জন্য আরও সুন্দর কিছু করতে চাই। আমি প্রথমে প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আমার এই লাইনে ১৬ বছর হয়ে গেছে। একদিন ঈদের সময় আমি একদিনেই ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আয় করেছি। এখন আল্লাহর রহমতে মাসিক আয় দুইয়ের আশেপাশে ওঠানামা করে।
আমি আমার হাজবেন্ডের অনেক ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। তার জীবনের সবচেয়ে ভালো দিন ছিল, যখন আমি তাকে ভরি দিয়ে একটা আংটি আর তার পছন্দের দুটি বাইক উপহার দিয়েছি।
যে আপুরা আমার কাজ পছন্দ করেন বা আমাকে চেনেন, তারা অবশ্যই সালিমার চিঠি তলার কাছে আসবেন।
আমাদের পার্লারের নাম রূপকন হারবাল বিউটি পার্লার।
আমার নাম রিয়ন ইসলাম বিজলি।
যোগাযোগ নম্বর: 01716892057।



