মাসে ৮০ লাখ টাকা রপ্তানি আয়! সোনার সুতায় তৈরি হচ্ছে রাজকীয় পোশাক।
পোশাক
বাইরের দেশের রাজা-বাদশারা যে পোশাকগুলো পরেন, সেগুলো আমরা বাংলাদেশেই তৈরি করছি। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এত সুন্দর, সূক্ষ্ম কাজ বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও পাবেন না। একটা পিস রেডি করতে আমাদের পাঁচ দিন সময় লাগে। এর মধ্যে লাইটিং আছে, আর এই জরির ভেতরে সোনা আছে। সোনা আর রুপা দিয়ে কাজ করা হয়। এই সোনা-রুপার মিশ্রণের কারণে কাপড়টা ঝলমল করে, দেখতে খুব সুন্দর লাগে। সেই কারণেই এই জিনিসগুলোর দাম বেশি।
পুরোটা যদি জার্মান জরিতে বানাই, তাহলে একটা পিস বানাতে দেড় লাখ টাকা খরচ পড়ে। আর যদি ভারতীয় আর জার্মান জরির মিক্স করি, তাহলে খরচ পড়ে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। আমাদের এমন একটা কারখানা আছে, যেখানে বিদেশের বাদশারা যে পোশাক পরে, সেটাই বাংলাদেশে তৈরি হয়। এটা সরকারেরও গর্বের বিষয়।
আমরা রেটটা একটু কম রাখি, তাই আমাদের বিক্রি বেশি হয়। এই ধরনের কাজ ওখানে ওরা করতে পারে না। আমাদের পণ্য ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ থেকে ছড়িয়ে যাবে। দুবাই যাচ্ছে, বাহরাইন যাচ্ছে, সব আরব কান্ট্রিতেই যাচ্ছে। সব আরব দেশেই আমাদের পিস আছে।
এই কারখানার উদ্যোগ আমি নিয়েছি সৌদি আরবে থাকার সময়। তখন সিদ্ধান্ত নিই যে এই কাজটা পুরোপুরি শিখব। আমি প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে ছিলাম। এই সময়ের মধ্যে সব কাজ শিখে ফেলি। আমার কাতারের একজন মহাজন ছিল। তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়। সে আমাকে কাতারে আসতে বলে। তখন কাতারে শুধু একটা খালি দোকান ছিল।
আমি তাকে বলি, সৌদি আরব থেকে মাল আনলে খরচ কম হবে, অথবা আমরা এখানে একটা কোম্পানি করি—তাতে দুজনেরই লাভ। সে আমাকে টাকা দেওয়া শুরু করে। আমি মাল এনে কাজ শুরু করি। প্রোডাকশন ভালো চলতে থাকে, আমরা লাভবান হই। পরে বুঝলাম, কাতারে কোম্পানি না করে বাংলাদেশে কোম্পানি করাই ভালো। তখন আমি বাংলাদেশে কোম্পানি খোলার উদ্যোগ নিই।
এখানে যে ছেলেপেলেগুলো কাজ করছে, তাদের এক এক করে নিয়ে এসে হাতে-কলমে কাজ শিখিয়েছি। শেখানোর পর কাজ শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ, মান ভালো হয়েছে এবং আমরা সফল হয়েছি। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে।
আমাদের কাজে ব্যবহৃত মালামালের একটাও বাংলাদেশি না। জার্মানি থেকে আনি, সৌদি আরব থেকে আনি, ভারত থেকে আনি, জাপানের কাপড় আনি, তুরস্ক থেকে সুতা আনি। এখানে প্রায় ২৫ জন মহিলা আর ২৫ জন পুরুষ কাজ করেন।
আমি সরকারের কাছে শুধু একটু সুদৃষ্টি চাই। টাকা-পয়সা চাই না। মাল আনতে অনেক সময় লাগে, কাস্টমসে অনেক ঝামেলা হয়। অথচ বাইরের দেশের বাদশারা যে পোশাক পরে, সেটা আমরা বাংলাদেশে বানাচ্ছি—এটা আমাদের অহংকার। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আমরা আরও বড়ভাবে কাজটা করতে পারব।
এই কাজের জন্য পাঁচ ধরনের কাজ লাগে—সুতা লাগে, কাপড় লাগে, জরি লাগে, হলুদ কাপড় লাগে, হলুদ সুতা লাগে। প্রথমে কাপড় সেলাই হয়, তারপর একের পর এক পাঁচজন কারিগর হাতের কাজ করে। পুরো কাজটাই হাতে করা হয়। এজন্যই কাজটা এত সুন্দর হয়। একটা পিস বানাতে পাঁচ দিন সময় লাগে। বানানোর পর হিট দেওয়া হয়, হাতুড়ি দিয়ে লাইটিং আনা হয়।
এই জরির ভেতরে সোনা আর রুপা আছে বলেই কাপড়টা জ্বলে। পুরো জার্মান জড়ি হলে খরচ দেড় লাখ, আর ভারতীয়-জার্মান মিক্স হলে খরচ ৭৫ হাজার। কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী আমরা কম্বিনেশন করি।
এরপর মালগুলো কার্গো বা ডিএইচএল দিয়ে পাঠাই। ডিএইচএল পাঠাতে খরচ অনেক বেশি। যেমন ৪৩ পিস পাঠাতে ৩৫ কেজি হয়, খরচ পড়ে প্রায় ২৩ হাজার টাকা। সরকার যদি এখানে একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আমাদের অনেক উপকার হয়।
আমি গ্রাম-এলাকার গরিব মেয়েদের কাজ শিখিয়েছি। যারা আগে ভিক্ষা করত, তারা এখন কাজ শিখে ভালো আয় করছে। একটা কাজ করলে ৭০০ টাকা পায়। পাঁচটা কাজ করলে শুধু কারিগরের মজুরিই হয় ৩৫০০ টাকা।
বাংলাদেশে এমন একটা কারখানা আছে যেখানে বিদেশি বাদশাদের পোশাক তৈরি হয়—এটা সরকারের গর্ব হওয়া উচিত। আমার মহাজন আমাকে দোকান দিয়েছে, সেখানে আমরা ব্যবসা করি, ভাড়া দেই। ওখান থেকে মাল বিক্রি করি।
আমি এখান থেকে যদি ১৪৫০ রিয়ালে মাল দেই, ওখানে সেটা বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ২৫০০ রিয়ালে। জার্মান জড়ির হলে বিক্রি হয় ৩৫০০ রিয়াল পর্যন্ত। বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ভালো আছি।
আমরা রেট কম রাখি বলেই বিক্রি বেশি। এই ধরনের মাল ওরা নিজেরা বানাতে পারে না। আমাদের পিস দুবাই, বাহরাইনসহ সব আরব দেশে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো—আমি চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। যত বানাতে পারি, সবই বিক্রি হয়ে যায়। কিছু কিছু জায়গায় শুধু মানুষজনকে খুশি রাখার জন্য মাল পাঠাই।
আমি বারবার একটাই কথা বলছি—সরকার যদি একটু সহযোগিতা করে, যদি মাল আটকে না রাখে, দ্রুত ছাড় করে দেয়, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারব। আলহামদুলিল্লাহ, তখন আমাদের জন্য অনেক ভালো হবে।



