নন্দিনী অপর্ণা এবং আমি: স্মৃতির ভেতর দিয়ে ইতিহাসের পথে
গোবিন্দলাল দাসের আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘নন্দিনী অপর্ণা এবং আমি’র পাঠ-পর্যালোচনা
কায়সার রহমান রোমেল :
কিছু বই পড়তে গিয়ে লেখকের জীবনের চেয়ে তাঁর সময়কে দেখার চোখটাই বেশি করে চেনা হয়ে যায়। গোবিন্দলাল দাসের ‘নন্দিনী অপর্ণা এবং আমি’ সেই ধরনের বই। কভারে এটি ‘আত্মজৈবনিক উপন্যাস’, কিন্তু পাতা ওল্টালে স্মৃতিকথার ভঙ্গি, সাংবাদিকের প্রতিবেদনী দৃষ্টি আর ইতিহাসের পুনর্পাঠ একসঙ্গে মিশে যায়। বইটির প্রধান সম্ভাবনা এই মিশ্রণেই, আবার প্রধান চ্যালেঞ্জও এখানেই।
লেখকের পরিচয় এই পাঠের গোড়ার কথা। ১৯৪৬ সালের ২৫ জুলাই গাইবান্ধা সদরের হাটলক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৯৬৬ সালে সাপ্তাহিক পূর্বদেশে যোগ দিয়ে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা, জনপদ, মুক্তকণ্ঠ ও যুগান্তর হয়ে বাংলাদেশ বেতারে আটান্ন বছর সাংবাদিকতা করেন। বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতিও ছিলেন। বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কারাবাসের অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। কাজেই উপন্যাসের নায়ক যখন মার্কসীয় আদর্শে বিশ্বাসী এক তরুণ, তখন পাঠক সেই চরিত্রের পেছনে লেখকের নিজের ছায়া খুঁজে পান।
ঘরের আলো, জনপদের আলো
বইয়ের শুরুটা বেশ আবেগঘন। প্রায় ছত্রিশ বছর পর জন্মস্থান হাটলক্ষ্মীপুরে ফেরার দৃশ্য দিয়ে বয়ান এগোয়। গাইবান্ধা শহর থেকে আট মাইল দূরের সেই গ্রাম লেখকের কাছে আসলে অনেক দূর। বাবার সরলতার সুযোগে সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার ক্ষোভ আর শৈশব-যৌবনের পরিসর হারানোর বেদনা সেই দূরত্ব তৈরি করেছে। জন্মস্থান এখানে একই সঙ্গে স্মৃতির আশ্রয় এবং পুরোনো ক্ষতের জায়গা। প্রশ্নটাও তাই, স্বাভাবিকভাবে ওঠে- মানুষ কি শুধু একটা জায়গা ছাড়ে, নাকি নিজের অতীতেরও একটা অংশ হারায়?
দিনাজপুর শহরের মেয়ে স্বপ্নাকে বিয়ে করে গ্রামে এনে সংসার পাতার অংশটি বইয়ের সবচেয়ে জীবন্ত অধ্যায়গুলোর একটি। ভাঙাচোরা রাস্তা, স্কুলে যাওয়ার কষ্ট, চিকিৎসার অভাব আর গরমে ঘুম না আসার বিবরণ এখানে কোনো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ছাড়াই উন্নয়নবৈষম্যের ছবি হয়ে ওঠে। ঘরে প্রথম বিদ্যুতের বাতি জ্বলা আর পাখা ঘুরতে দেখে সন্তানদের হাততালির দৃশ্যটি ছোট, কিন্তু মনে থেকে যায়। নগরের মানুষের কাছে যা প্রায় অদৃশ্য সুবিধা, প্রান্তিক জনপদে তা কত বড়ো প্রাপ্তি, দৃশ্যটি সেটাই বুঝিয়ে দেয়। এখানে সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ আর কথাসাহিত্যিকের সম্ভাবনা একসঙ্গে কাজ করেছে।
ব্যক্তিগত সংকটে ইতিহাসের ছায়া
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর বাংলাদেশে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ায়, তার বিবরণ বইটির আরেক উল্লেখযোগ্য অংশ। স্ত্রীকে নিয়ে হাটলক্ষ্মীপুর থেকে গাইবান্ধায় ফেরার পথে লেখক মন্দিরে হামলা, আর ব্রিজ রোডের কালীমন্দিরে ভাঙা প্রতিমা পড়ে থাকার দৃশ্য দেখেন। স্ত্রীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার তাড়না আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার উদ্বেগ এখানে এক হয়ে যায়। সহিংস মিছিলে কিছু মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি নিয়ে তাঁর নৈতিক অস্বস্তিও লুকানো থাকে না। ইতিহাস তাই এখানে জাতীয় ঘটনার তালিকা নয়, একটি জনপদের ভয়, প্রতিবাদ আর বিবেকের কথা।
তবে এ অংশে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্যের জায়গা ছিল। কোন মন্দিরে কত ক্ষতি হয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্তরা কী বলেছিলেন, প্রশাসন কী করেছিল, পরে সামাজিক সম্পর্ক কীভাবে বদলাল, এসব থাকলে বিবরণ আরও অনুসন্ধানী হতো। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, শোনা কথা আর পরের বিশ্লেষণের মধ্যে ফারাকও স্পষ্ট রাখা দরকার ছিল।
উপন্যাসের ক্যানভাস
ফ্ল্যাপের ভাষ্য অনুযায়ী, উপন্যাসের পরিসর আরও বড়ো। পাকিস্তানি শাসনের শোষণ, বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রবাসী সরকারের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিব বাহিনীর টানাপড়েন, শরণার্থীদের দুর্দশা, এমনকি কলকাতার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নকশাল আন্দোলনের পটভূমিও এতে আছে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে নায়কের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, হতাশা আর এক নারীর ভালোবাসায় নতুন করে স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের এই বিশাল ঘটনাপ্রবাহের ভেতর একজন মার্কসবাদী তরুণের বিপর্যয় ও জেগে ওঠা বইটির মূল শিরা।
এখানে লেখকের এক বিরল সুবিধা কাজে লাগে। যিনি নিজে সময়টা দেখেছেন, বামধারার রাজনীতির ভেতর থেকে দেখেছেন, কারাগারও দেখেছেন, তাঁর কণ্ঠে সরকারি ইতিহাসের বাইরের এক ধরনের অভিজ্ঞতা শোনা যায়। রাষ্ট্রীয় ইতিহাস যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট আড়াল করে, সেখানে এমন ব্যক্তিগত বয়ান সেই ফাঁক পূরণ করতে পারে। শর্ত একটাই- স্মৃতির সঙ্গে যাচাইযোগ্য তথ্যের সচেতন সংলাপ থাকতে হবে। কালানুক্রম, স্থান, ব্যক্তি আর উৎস যত পরিষ্কার হবে, মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল অধ্যায়ে পাঠকের আস্থা তত বাড়বে।
যেখানে প্রশ্ন থেকে যায়
৪৫৬ পৃষ্ঠার বইয়ে বর্ণনা কখনো কখনো এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় এত দ্রুত সরে যায় যে, তাৎপর্য খুঁজে নেওয়ার ভার পাঠকের ঘাড়ে পড়ে। সাংবাদিকের চোখ ঘটনার খুঁটিনাটি ধরতে পারে, কিন্তু সাহিত্যে দরকার নির্বাচিত দৃশ্য, সংযত ভাষা আর ভেতরের দ্বন্দ্ব। কিছু পুনরাবৃত্তি ছেঁটে দিলে, বিশেষ করে কোনো ঘটনার পরিণতি পরের অনুচ্ছেদে আবার ব্যাখ্যা না করলে, দৃশ্যগুলোর নিজের শক্তি আরও খুলত। তবে দীর্ঘতা নিজে কোনো দোষ নয়। কয়েক দশকের জীবন আর সমাজ ধরতে বড়ো পরিসরই লাগে। প্রশ্ন হলো, সেই দৈর্ঘ্য পাঠককে নতুন কিছু দিচ্ছে কি না?
চরিত্র নিয়েও একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। স্বপ্না ধৈর্য আর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে এলেও, তাঁর নিজের মনের ভেতর, দ্বিধা, আকাঙ্ক্ষা আর মতবিরোধ স্বামীর দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। শিরোনামের নন্দিনী ও অপর্ণাকে ঘিরেও পাঠকের প্রত্যাশা তৈরি হয়। কভারের ছবিতে ধূসর-সবুজ জমিনের ওপর কালো ছায়ামূর্তিদের মাঝে এক ফোঁটা লাল যেন সেই অন্তরঙ্গ সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করে। বইয়ের বিশাল ইতিহাস-বিস্তারে সেই সম্পর্ক কতটা কেন্দ্রে থাকে, সেটি পাঠের বিষয়।
শেষ কথা
‘নন্দিনী অপর্ণা এবং আমি’-র সবচেয়ে বড়ো অর্জন, লেখক নিজের জীবনকে সমাজ ও রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখেননি। ব্যক্তিগত ক্ষোভের ভেতরে সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিগত শোকের ভেতরে সময়ের বদল, চেনা জনপদের ভেতরে ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া, এই দেখাটাই বইয়ের জোর। আরও সংহত সম্পাদনা, তথ্যের দৃঢ়তর ভিত আর অন্য চরিত্রদের নিজস্ব কণ্ঠ পেলে এই বইটি কেবল একজন সাংবাদিকের জীবনবৃত্তান্ত থাকত না, গাইবান্ধা ও সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারত সেই সম্ভাবনা বইটিতে স্পষ্ট।
গ্রন্থপরিচিতি:
গ্রন্থ: নন্দিনী অপর্ণা এবং আমি
লেখক: গোবিন্দলাল দাস
ধরণ: আত্মজৈবনিক উপন্যাস
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রকাশক: আলমগীর সিকদার লোটন ও সুর জাহান পুনম
প্রকাশনা সংস্থা: আকাশ
প্রকাশকাল: বাংলা একাডেমি অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৬
পৃষ্ঠা: ৪৫৬
মূল্য: ৫৫০ টাকা
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী