৮০০ টাকার পুঁজি থেকে লাখপতি: হালিম বিক্রেতা জাহিদুলের অদম্য যাত্রা
হালিম
৮০০ টাকা তবিল দিয়ে আমি এই হালিমের ব্যবসা শুরু করি। আজকে আমি দৈনিক ১১ হাজার, ১২ হাজার টাকার মাংস কিনি। সাধারণ দিনে ১৬ হাজার, ১৭ হাজার টাকা বিক্রি হয়, অনেক সময় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকাও বিক্রি হয়।
আমার আব্বার তেমন কিছুই ছিল না। দুই ভাইয়ের মধ্যে আমরা সাড়ে তিন শতক করে জায়গা পেয়েছি। আল্লাহর কাছে আশা ছিল—তিনি যদি আমাকে একটা দোতলা বাড়ি করার তৌফিক দেন। আল্লাহ পাক সেই তৌফিক দিয়েছেন। আজ আমি বাড়ি করেছি, বাড়ি করেই ব্যবসা দাঁড় করিয়েছি। দেখা যায়, যার ৫০ বিঘা জমি আছে সে পর্যন্ত বাড়ি করতে পারে নাই, আর আমার বাপের কিছু না থাকলেও আমি বাড়ি করেছি।
এই ব্যবসা শুরুটা খুব কষ্টের ছিল। তখন চালের কেজি ছিল ১৩ টাকা, অথচ সেটাও জোগাড় করা ছিল অনেক কষ্টের। গ্রাম ব্যাংক থেকে আমি ৮ হাজার টাকা লোন নিই। সেই টাকায় দুই চাকার একটা ঠেলাগাড়ি বানাই। আরও ২ হাজার টাকা দিয়ে আরেকটা ঠেলাগাড়ি বানাই। ৪ হাজার টাকা দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল কিনি। আর ২ হাজার টাকা তবিল রাখি। এই ২ হাজার টাকার তবিল দিয়েই আজ আমার ব্যবসা এত বড় হয়েছে।
আমার মায়ের পেটের ভাই ছিল। একই বাপের সন্তান। তাকে আমি ব্যবসায় বসাই। বলেছিলাম, ২১ দিন সময় দিলাম। কিন্তু সে মানুষের প্ররোচনায় পড়ে ব্যবসাটা ঠিকভাবে ধরতে পারেনি। এরপর সে ঢাকায় চলে যায়। আজ পর্যন্ত আমি তার মুখ দেখতে পাইনি। টাকা-পয়সাও আর পাইনি।
আমি কালি বাজারে আজহার কসাইয়ের ছেলে থেকে বাকিতে মাংস নিই। উনি আমাকে বিশ্বাস করেন। বলেন, “তুমি এত মাংস নিয়ে যাও, জানি তুমি ব্যবসা করো।” সাধারণ বিক্রিতে যেখানে কেজি ৬৮০ টাকা, আমার কাছে তিনি ৬৫০ টাকায় দেন। আমি একদিনে ১০–১১ হাজার টাকার মাংস নিই।
আমার দোকানে কোনো কর্মচারী নেই। আমি নিজে বেতন ধরি ২০০ টাকা। আমার দুই ছেলের বেতন ৪০০ টাকা। আমার ছোট ছেলের বেতন ২০০ টাকা। আমার স্ত্রীর বেতন ২০০ টাকা। এখানেই আমার হিসাব।
আমার দোকানে প্রথমে হালিম বিক্রি হয়, পরে লেহেরি। হালিমের দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। ধাপে ধাপে দাম—১০০, ১৫০, ২০০, এভাবে। ৩৫০ টাকার হালিমের ওজন প্রায় ৬০০ গ্রাম হয়। গরুর পা ৭০ টাকা প্লেট, একটি পায়া ৬০ টাকা, গিড়া ১০০ টাকা, বড় গিড়া হলে ১৫০ টাকা।
এটা হচ্ছে অরিজিনাল কালিরবাজার গরুর হালিম। এখানে কোনো সয়াবিনের গোটা মেশানো হয় না। অনেকেই কালোবাজারি করে, কিন্তু আমি সেটা করি না। ১০০ টাকার ললিতে ৫০ টাকার হালিম আর ৫০ টাকার ললি থাকে। এই ১০০ টাকার হালিম শহরের ভিতরে খেতে গেলে ১২০–১৫০ টাকা দিতে হয়।
আমি প্রতিদিন বিকেল তিনটার দিকে দোকান খুলে প্রস্তুতি নেই। পাঁচটার পর থেকে বিক্রি শুরু হয়। মাগরিব থেকে এশার মধ্যে ব্যবসা প্রায় শেষ হয়ে যায়। মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় আল্লাহ দিলে ১৬–১৭ হাজার টাকা বিক্রি হয়।
আমি ঢাকা শহরে আগে রিকশা চালাতাম। রিকশা চালাতে চালাতে ফরিদাবাদ এলাকায় এক শরীয়তপুরের ভাইয়ের কাছে হালিমের কাজ শিখি। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিই। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তোমার হাতে যেটা হবে, আরেকজনের হাতে সেটা হবে না।” সেই পরামর্শই আমাকে আজ এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।
অনেক সময় দোকান না পেয়ে রাতে বাড়ি গিয়ে চোখের পানি ফেলেছি। স্ত্রীকে বলেছি—আমি আর পারবো না। কিন্তু মানুষ আমাকে ভালোবাসে। শহর থেকে লোক আসে, খেয়ে যায়, আবার অন্যদের বলে। এভাবেই ধীরে ধীরে পুরো গাইবান্ধা জেলায় আমার পরিচিতি হয়েছে—সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, তুলসীহাট, উড়াবাজার, বোনারপাড়া—সব জায়গা থেকে মানুষ আসে।
আজ আমি ৮০০ টাকা দিয়ে শুরু করে এই জায়গায় এসেছি। আগে চারটা গরুর পা ১৫০ টাকায় কিনতাম, আজ চারটা পা কিনতে লাগে ৩২০০ টাকা। মাংসের কেজি আগে ছিল ২৫০ টাকা, আজ ৬৮০ টাকা। তারপরও আমি ৫০ টাকায় হালিম বিক্রি করি। কখনো দেখা যায়, ৫০ টাকার হালিমে আমার লাভ হয় মাত্র দুই টাকা।
আমার স্ত্রী বাড়িতে প্রতিদিন ১০ কেজি ময়দা দিয়ে রুটি বানায়। ৩০০টা রুটি বিক্রি করি ১০ টাকা করে—৩০০০ টাকা। এইভাবেই আমার সংসার চলে।
বাড়ি করার সময় অনেক ঋণ করেছি। এখন একটাই আশা—আল্লাহ যেন আমাকে সৌদি আরবে ওমরা ও হজ করার তৌফিক দেন। সেই নিয়ত আমি আল্লাহর কাছে করে রেখেছি।



