আগুনের লেলিহান শিখায় জীবন !

একপাশে গনগনে আগুন, অন্যপাশে ধুলোবালি আর ধোঁয়ার কুন্ডলী। তপ্ত এই আগুনের ওপর দাঁড়িয়েই প্রতিদিন রুটি-রুজির সন্ধান করেন একদল মানুষ। যেখানে অসাবধানতায় এক মিনিটে ছাই হয়ে যেতে পারে আস্ত একটি দেহ, সেখানেই কাঠের জুতো পায়ে দিয়ে দিনরাত কাজ করে চলছেন ইটভাটার শ্রমিকরা। আগুনের এই ভয়াবহতা তাদের মনে করিয়ে দেয় পরকালের দহনকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা

একপাশে গনগনে আগুন, অন্যপাশে ধুলোবালি আর ধোঁয়ার কুন্ডলী। তপ্ত এই আগুনের ওপর দাঁড়িয়েই প্রতিদিন রুটি-রুজির সন্ধান করেন একদল মানুষ। যেখানে অসাবধানতায় এক মিনিটে ছাই হয়ে যেতে পারে আস্ত একটি দেহ, সেখানেই কাঠের জুতো পায়ে দিয়ে দিনরাত কাজ করে চলছেন ইটভাটার শ্রমিকরা। আগুনের এই ভয়াবহতা তাদের মনে করিয়ে দেয় পরকালের দহনকে।

কাঠের জুতোয় আগুনের পথ চলা

ইটভাটার ওপরের তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে সাধারণ চামড়া বা প্লাস্টিকের জুতো গলে যায়। তাই শ্রমিকরা নিজেদের রক্ষায় ব্যবহার করেন বিশেষ ধরনের ‘কাঠের খড়ম’ বা জুতো। এই তপ্ত লাভার মতো হিটের ওপর খালি পায়ে বা সাধারণ জুতোয় দাঁড়ানো অসম্ভব।

জাহান্নামের আগুনের প্রতিচ্ছবি

সারাক্ষণ আগুনের সাথে যুদ্ধ করা এই শ্রমিকরা আগুনের তীব্রতা দেখে শিউরে ওঠেন। তাদের মতে, এই আগুনই যদি এমন ভয়াবহ হয়, তবে জাহান্নামের আগুন না জানি কেমন হবে! এক শ্রমিক বলেন:

"এখানে একটা মানুষ পড়লে তার হাড্ডির কোনো অস্তিত্ব থাকবে না, নিমেষেই শেষ হয়ে যাবে। পেটের জ্বালায় আমরা জেনেশুনেই এই আগুনের ওপর কাজ করছি।" [

কাজের ধরন ও ঝুঁকি

ইট পোড়ানোর সময় আগুনের রঙের পরিবর্তন দেখে তারা বুঝতে পারেন ইট তৈরি হয়েছে কি না। আগুনের রঙ যখন সাদা হয় তখন ইট পোড়া সম্পন্ন হয়, আর রূপালি বা লাল থাকলে আরও পোড়াতে হয়। ১০ মিনিট পরপর কয়লা দিতে হয় যাতে তাপমাত্রা বজায় থাকে। ধুলোবালির কারণে শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি থাকলেও পেটের দায়ে তারা নিরুপায়।

অভাবের সংসার ও জীবিকা

বছরের ৪ থেকে ৬ মাস তারা ভাটায় কাজ করেন। এই সময় যে বেতন পান তা দিয়েই চলে তাদের পরিবারের খরচ। ভাটার মৌসুম শেষ হলে তারা কৃষি কাজে যুক্ত হন। সঞ্চয় বলতে তাদের কিছুই নেই, শুধু দিন এনে দিন খাওয়ার কষ্টের জীবন। 

নিরাপত্তা ও নিয়তি

সারাক্ষণ আগুনের ওপর চলাফেরা করলেও তারা এটিকে নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন আল্লাহই তাদের রক্ষা করছেন। আগুনের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা সম্ভব হয় না, ৫-১০ মিনিটেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তবুও সর্দার, মাঝি বা মিস্ত্রী হিসেবে তারা এই আগুনের সাথে মিতালি করেই পার করছেন বছরের পর বছর। 

আগুনের এই ভয়াবহতা আর জীবন-সংগ্রামের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কত কষ্টের বিনিময়ে তৈরি হয় আমাদের মাথার ওপরের নিরাপদ ছাদ।