'হাতে টানা' কাঁচি শান: দুই যুগ ধরে টিকে থাকার লড়াই

একপাশে সজোরে ঘুরছে পাথরের চাকতি, আর তার ওপর ঘর্ষণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ধারালো হচ্ছে কাঁচি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন প্রায় সবখানেই মোটরচালিত মেশিনে নিমেষেই শান দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু গাইবান্ধার এক প্রবীণ কারিগর আজও আঁকড়ে ধরে আছেন দুই যুগের পুরনো ‘হাতে টানা’ শান দেওয়ার পদ্ধতি। যা এখন কেবল একটি পেশা নয়, বরং এক বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের শেষ চিহ্ন।

নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা

একপাশে সজোরে ঘুরছে পাথরের চাকতি, আর তার ওপর ঘর্ষণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে ধারালো হচ্ছে কাঁচি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন প্রায় সবখানেই মোটরচালিত মেশিনে নিমেষেই শান দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু গাইবান্ধার এক প্রবীণ কারিগর আজও আঁকড়ে ধরে আছেন দুই যুগের পুরনো ‘হাতে টানা’ শান দেওয়ার পদ্ধতি। যা এখন কেবল একটি পেশা নয়, বরং এক বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের শেষ চিহ্ন।

যে হাতে ধার, সেই হাতেই জীবন-সংগ্রাম

ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর সংসারের ভার এসে পড়েছিল তার কাঁধে। পড়াশোনা ছেড়ে প্রথমে ঠেলাগাড়ি চালাতেন, পরে এক ওস্তাদের কাছে কাঁচি শান দেওয়ার কাজ রপ্ত করেন। ওস্তাদ মারা যাওয়ার পর থেকে গত ২৪ বছর ধরে তিনি একাই এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটিকে টিকিয়ে রেখেছেন।

হাতে টানা শানের যাতনা ও বিশেষত্ব

এই পদ্ধতিতে কাজ করতে দুজন মানুষের প্রয়োজন হয়। একজন দড়ি দিয়ে পাথরের চাকতিটি ঘোরান আর প্রধান কারিগর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাঁচিটি পাথরে ধরে শান দেন। তিনি জানান:

"পাথরের ওপর কেঁচিটা ধরার সময় তাল-বেতাল হলে বিপদ। শরীরের সব শক্তি দিয়ে প্লাস দিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। অনেক সময় কেঁচির ঘষায় হাত ফেটে রক্ত ঝরে, কিন্তু কষ্ট না করলে তো কেউ পয়সা দিবে না।"

অতীতের সুদিন বনাম বর্তমানের অভাব

এক সময় সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ির চরাঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ আসতেন তার কাছে কাঁচি শান দিতে। দুই যুগ আগে দিনে ৭০০-৮০০ টাকা আয় হলেও এখন আধুনিক মোটরের দাপটে তা নেমে এসেছে মাত্র ২০০-৩০০ টাকায়। কোনো কোনো দিন তো কাজই জোটে না।

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে

বাবা মারা যাওয়ার পর স্কুল জীবন শেষ হওয়ার সাথেই যেন তার রঙিন স্বপ্নগুলোও শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন একমাত্র মেয়ের বিয়ে আর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাটাই তার মূল চিন্তা। তিনি বলেন:

"আজ আছি কাল নেই, ভবিষ্যতের চিন্তা করে কী হবে? যতদিন আল্লাহ হায়াতে রাখছে, এই কেঁচি শান দিয়েই সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।"

আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে এই আদি পেশাটি হয়তো একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে, কিন্তু এই প্রবীণ কারিগরের আত্মবিশ্বাস আর মেহনতি হাতগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক জীবন-সংগ্রামী যোদ্ধার গল্প।