লাশ ঢাকারও সময় পায়নি তারা
গাইবান্ধার প্রধান বধ্যভূমিতে একাত্তরের বীভৎস গণহত্যার স্মৃতি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গাইবান্ধা জেলা সদরে যে ভয়াবহ গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তার এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের বর্তমান শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকা। ‘Songjog’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে এই বধ্যভূমির লোমহর্ষক ইতিহাস এবং বর্তমান অবহেলার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গণহত্যার প্রেক্ষাপট ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ২৯ ক্যাভলরি ট্যাংকের বহর নিয়ে পাকবাহিনী গাইবান্ধায় প্রবেশ করে। তৎকালীন গাইবান্ধা মহকুমার প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করা হয় হেলাল পার্ক (বর্তমান শাহ আব্দুল হামিদ স্টেডিয়াম) এলাকায়। স্টেডিয়ামের পাশের অফদা (WAPDA) রেস্ট হাউসটি ছিল পাক অফিসারদের আবাসস্থল, আর সংলগ্ন গোডাউনটি ব্যবহৃত হতো মূল নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে।
নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ধরন রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসদের সহযোগিতায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নারী-পুরুষদের ধরে এনে এখানে অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হতো। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে:
-
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে টর্চার সেলে নির্যাতন করে হত্যা করার পর গর্ত করে পুঁতে রাখা হতো।
-
ক্যাম্পের একজন তৎকালীন কর্মী জানান, এখানে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ নারী-পুরুষকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
-
৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী গাইবান্ধা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয়রা এসে দেখেন, অগণিত মানুষের হাত মাটির ওপর বের হয়ে আছে। তাড়াহুড়ো করে পালানোর সময় তারা লাশগুলো ঠিকমতো ঢাকারও সময় পায়নি।
শহীদদের পরিচয় এখানে শুধুমাত্র শহর নয়, বরং লক্ষ্মীপুর, কামারপাড়া, বোয়ালীসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে ধরে আনা হতো সাধারণ মানুষদের। শহীদদের মধ্যে জগৎ কর্মকার, বিজয় কুমার রায় এবং বোয়ালী গ্রামের একই পরিবারের তিনজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বিমান বাহিনীর আশরাফ নামের একজনকেও এখানে টর্চার করে হত্যা করা হয়।
সংরক্ষণের দাবি ও বর্তমান অবস্থা গাইবান্ধা জেলায় প্রায় ৩০টি বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা হলেও অধিকাংশেরই কোনো স্থায়ী সংরক্ষণ করা হয়নি। সদরের এই প্রধান বধ্যভূমিটি আজও অরক্ষিত। বধ্যভূমি সংরক্ষণ কর্মীদের মতে, যথাযথ উদ্যোগের অভাবে অনেক বধ্যভূমি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে।
শহীদ পরিবারগুলোর দাবি, স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও এই পবিত্র ভূমিগুলো যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দিতে এই বধ্যভূমিগুলো অতি দ্রুত সংরক্ষণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।



