দিনরাত মৃত্যুঝুঁকি, তবুও নেই ভরসা

করাত কল

নিজস্ব প্রতিবেদক: অভাবের তাড়নায় শৈশবেই পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয় তাদের। পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত করাত কলে ভারী কাঠ কাটার কাজ করে যাচ্ছেন একঝাঁক প্রান্তিক শ্রমিক। ‘সংযোগ’ চ্যানেলের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই এক করাত কল শ্রমিকের মর্মান্তিক ও বাস্তব জীবনের চিত্র।

কঠিন পরিশ্রম ও শারীরিক কষ্ট: প্রতিবেদনে ওই শ্রমিক জানান, টানা প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে তিনি এই পেশার সাথে যুক্ত আছেন। বাপ-দাদার আমলের চরম অভাবের কারণেই তাঁকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নামতে হয়েছে। পাঁচ থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত বড় বড় ভারী গোল কাঠ কাটতে ৭-৮ জন শ্রমিক মিলে তা সামলাতে হয়। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে অনেক সময় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, চোখ দিয়ে আগুন ঝরার মতো অবস্থা তৈরি হয়। টানা কয়েক দিন বড় কাঠ কাটলে খাবারে রুচিও চলে যায়।

সর্বক্ষণ মৃত্যুঝুঁকি ও দুর্ঘটনার ভয়: করাত কলের কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক। মেশিনের ব্লেড বা করাত ছিঁড়ে গেলে শরীরের অস্তিত্ব পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। এ পর্যন্ত বহু শ্রমিকের হাত, পা, আঙুল কিংবা নখ কেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্বয়ং ওই শ্রমিকেরও একটি আঙুল কেটে গেছে এবং অন্য এক দুর্ঘটনায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া হাই-স্পিডে চলা মোটর বা করাতের দাঁত ভেঙে মাথায় কিংবা চোখে লেগে অনেকের মাথা ফেটে যাওয়ার মতো মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটে।

অনিশ্চিত আয় ও মানবেতর জীবনযাপন: কাজের কোনো নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই। যেদিন কাজ থাকে সেদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাজ করতে হয়। কখনো কখনো কাজ শেষ করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল বা রাতও বেজে যায়। কিন্তু কাজ না থাকলে বসে থাকতে হয়, আর তখন ধার-দেনা বা কিস্তি তুলে সংসার চালাতে হয়। অনেক সময় দাড়ি কাটার মতো সামান্য খরচটুকুও হাতে থাকে না। সারাক্ষণ হাতের ওপর জীবন নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর থেকে বের হন তাঁরা। জমজমি বলতে কিছু নেই, অল্প কিছু জমি বন্ধক রাখা আছে।

নতুন প্রজন্মের অনীহা ও শ্রমিকের সংকট: বর্তমান প্রজন্মের যুবকরা এই অতিরিক্ত পরিশ্রম ও জীবনের ঝুঁকি নিতে চায় না। বড় গাছ কাটার সময় তারা কাজ করতে ভয় পায় এবং এই কাজে আসতে চায় না। এর ফলে করাত কলগুলোতে এখন পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিনশেষে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা এই শ্রমিকদের জীবন কেবলই এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।