বাউল সন্তোষের দু:খ গাঁথা

আমার চোখ—এই দুই চোখে আঘাত লেগে চোখের আলো একদিন নিভে গেল। ফেটে গেল নিঃশব্দে। রক্ত নেই, আছে শুধু পানি। দু–তিনবার এমন হয়েছে। আলো–অন্ধকারের ভেদাভেদ আর বুঝি না। চেনা পৃথিবী আজ আমার কাছে অচেনা।

চোখ নেই বলেই আমি দেখি না- মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে, ঘর কোথায়, গাছ কোথায়—সবই অদৃশ্য।

হেঁটে চলতে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছি, ঘরের দেয়ালে লুটিয়ে পড়েছি, মানুষের শরীরে লেগে গেছে আমার অসহায় শরীর। খাবি খেয়েছি বারবার। মাথা ফেটেছে তিনবার। একদিন তো নিজের ঘরের মগিতেই পড়ে গিয়েছিলাম।

এই দেশ আমার—কিন্তু এই দেশে আমার ঘর হবে কীভাবে? আগে ধান কাটে কৃষক। রোদে–বৃষ্টিতে ভিজে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রক্ত–মাংস পানি করে সে বাঁচিয়ে রাখে বাংলাদেশকে। অথচ ফসল ফলিয়েও সে ন্যায্য দাম পায় না।

দেখুন, আমার এই যন্ত্রটাই আমার গান। গান আমার পেশা নয়, গান আমার বংশগত উত্তরাধিকারও নয়। তবু জীবনের প্রয়োজনে আমি গানকেই বেছে নিয়েছি কর্ম হিসেবে।

হাটে–বাজারে, গ্রামগঞ্জে, শহর আর বন্দরে ঘুরে বেড়াই। দুই–চার পা হেঁটে দশ টাকা করে দিনের শেষে যা জোটে, সেটুকুতেই আমার জীবন।

মায়ের একধার দুধের দাম কোনোদিন শোধ হয় না।
কাটে গায়ের চাম, পাপস বানালে—এই ঋণ শোধ করার মতো দরদী আর কেউ হয় না। আমার মায়ের মতো দরদী আর কেউ হয় না। মা গো, আমার গান অনেকেই নিয়েছে।
মিডিয়ায় ছড়িয়েছে, ভাইরাল হয়েছে। আমাকে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য আশ্বাস— কেউ দিয়েছে দশ টাকা, কেউ বিশ, কেউ একশ। বলেছে, ভবিষ্যতে অনেক কিছু দেবে। কিন্তু কথার সঙ্গে কাজের মিল পাইনি। আজ তারা আর আমার খোঁজ নেয় না। ভাগ্য বোধহয় আমার কপালে সুখ লেখেনি।

গ্রামেই ছিল আমার জীবন। গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে যেটুকু চাল জুটত তাতেই দিন চলত। কোনো রকমে বেঁচে ছিলাম। তারপর জীবনের একজন মানুষ এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। আরেকজনকে নিয়ে চলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার বুদ্ধির অভাব। তাকে সঙ্গে নিয়ে হাটে–বাজারে ঘুরে বেড়িয়েছি অনেকদিন। আজ আমি একা। তবু সাহস করে বের হই। প্রায় পনেরো বছর ধরে এই লাঠিটার ভরসায় আমি পথ চলছি। আমি অন্ধকারে বাস করি। দেখার কোনো শক্তি নেই। দিন শুধু অনুভব করা যায়। মানুষের শব্দে বোঝা যায়—কে কাছে, কে দূরে। গায়ে লাগলে বুঝি— মানুষ আছে।

হে ঈশ্বর,
তুমি ধনের পিতা,
গরিব কি তোমার সন্তান নয়?
গরিবের কান্না
তুমি কেন শুনতে পাও না?
সবাই তো তোমারই দান।

আমি আর হাটে–বাজারে থাকতে চাই না। শহর–বন্দরে ঘুরে বেড়াতেও চাই না। আমার স্বপ্ন ছিল—কেউ যদি আমাকে আত্মিকভাবে একটু সহায়তা করতো, তাহলে হয়তো আমি একটু সামনে এগোতে পারতাম। আজ মোবাইলের যুগে হাট–বাজার ফাঁকা। মানুষ থামে না। আমার আয় কমে গেছে। এই আয় দিয়ে সংসার চলে না। আমার ছেলেকে যদি একটা ছোট ব্যবসা ধরিয়ে দেওয়া যায়, লেখাপড়ার পাশে দাঁড়িয়ে সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। গরুর খামার হোক, ছোট দোকান হোক— সবকিছুর জন্যই টাকার দরকার।

সুপ্রিয় দর্শক, আপনারা যেখানে আছেন— দেশে কিংবা প্রবাসে—আপনাদের জানাই আমার অন্তরের শুভেচ্ছা। আপনারা আমার গান শুনেছেন, দেখেছেন বিভিন্ন মাধ্যমে।  কিন্তু পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ খুব কমই পেয়েছি। আমার অনুরোধ— যদি ভবিষ্যতে দয়া থাকে, আমার পাশে দাঁড়াবেন। যেন আমাকে আর হাটে–বাজারে ভিক্ষার মতো গান গাইতে না হয়।

আপনাদের দোয়া আর আশীর্বাদ নিয়েই বলছি—জিনিসের দাম আগুন, কিনবো কীভাবে? সবাই দেনায় ডুবে, কেউ কারও নয়।