বারবার লোকসান, শেষে সফলতা!

আমি যখন প্রথম বাচ্চা ফুটাই, তখন আসলে আমার নিজের তেমন কোনো আইডিয়া ছিল না। আমি বুঝতে পারিনি যে পানির কারণে বাচ্চাগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে প্রায় এক হাজার বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। এটা ছিল আমার একেবারে শুরুর স্টেজে করা বড় ভুল।

এরপর একবার গাম রোগ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সেই কারণে আমার প্রায় চারশ থেকে পাঁচশ মুরগি নষ্ট হয়ে যায়। তারপর আমি অনেকদিন গ্যাপ রাখি, যাতে ওই ভাইরাসটা আর না থাকে। আসলে কোনো রোগ হলে সেই জায়গাটা ফাঁকা রাখতে হয়, মিনিমাম চার-পাঁচ মাস। টাকা-পয়সার চেয়ে ওই সময়টা নষ্ট হওয়াটাই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বড় লস।

ভিতরে ভিতরে খুব খারাপ লেগেছে, হতাশাও এসেছিল। কাজ শুরু করার সময়ই এমন একটা ধাক্কা খাওয়া সত্যিই কষ্টের। তারপরও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন মোটামুটি ভালো আছি।

এখন আমার এখানে ফাওমি আছে, দেশি আছে, কোয়েল আছে। আপাতত মেইনলি ফাওমিতেই কাজ করছি, কারণ দেশি পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার যে বাসাটা, সেটা একসময় পুরো বিল্ডিংটাই খামার ছিল। নিচের এই জায়গাটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ভাবলাম, এটা কীভাবে কাজে লাগানো যায়। সেই চিন্তা থেকেই প্রায় এক দেড় বছর আগে এই খামার আর হ্যাচারি শুরু করি।

হ্যাচারি প্রথম থেকেই ছিল, সাথে মুরগিও ছিল। তখন লেয়ার মুরগি ছিল, যেগুলো আমরা ঢাকা থেকে কিনে আনতাম। তখন ঢাকায় ছাড়া আর কোথাও বাচ্চা পাওয়া যেত না। আসলে মাছ-মুরগির কাজের সাথে আমি অনেক আগেই যুক্ত ছিলাম। এটা আমার বাবার কাজ ছিল, এক ধরনের পারিবারিক অভ্যাস বলা যায়।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা—এটা শুধু আমার না, সব খামারির—ফিডের দাম। ফিডের দাম এত বেশি যে ডিম বা মাংস বিক্রি করে প্রফিট করা খুব কঠিন হয়ে যায়। মাংসের বাজার খারাপ, ডিমের বাজারও খারাপ, কিন্তু ফিডের দাম এক টাকাও কমেনি।

শুরুর ইনভেস্টমেন্ট ছিল প্রায় ৫০–৬০ হাজার টাকার মতো। ধন কোয়েল দিয়ে শুরু করি, তারপর আস্তে আস্তে বাড়ে। আমি মনে করি, যেকোনো খামারে সফল হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার পরিশ্রম আর সময় দেওয়া। আর অবশ্যই এই কাজ সম্পর্কে জেনে নামতে হবে। না জেনে নামা যাবে না।

আর যদি কেউ নিজে ফিড বানাতে পারে, তাহলে তাকে সফল হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। মুরগির ঠান্ডা লাগছে কিনা, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি আছে কিনা, ঠিকমতো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে কিনা—এই বিষয়গুলো নিয়মিত খেয়াল রাখতে হয়। কোনো মুরগি মারা গেলে আমি পোস্টমর্টাম করাই। এতে কোনো টাকা লাগে না, কিন্তু এতে বোঝা যায় সমস্যাটা কোথায়।

কলমি শাক, মুলা শাক, পেঁপে পাতা, মাঝে মাঝে নিম পাতা—এগুলো মুরগিকে খাওয়ালে অনেক উপকার পাওয়া যায়। যেহেতু আমি হ্যাচারি আর ডিম দুটোই করছি, তাই শুরুতে সব খরচ বাদ দিয়ে আল্লাহর রহমতে মাসে ২০–২৫ হাজার টাকার মতো থাকে। তবে সঠিকভাবে করলে এক দেড় লাখ টাকা লাভ করাও সম্ভব।

আমার মুরগিগুলো ১০০% দেশি না, তবে প্রায় ৯০% দেশির মতো। সোনালী ব্রয়লারের চেয়ে অনেক ভালো। এই কাজে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—কখনো হতাশ হওয়া যাবে না। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা হতে পারে, নিজের ভুলেও হতে পারে।

একবার আমার প্রায় ২০০০ লেয়ার মুরগি একসাথে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই আমি সবচেয়ে বড় শিক্ষা পাই—যখনই কোনো মুরগি অসুস্থ দেখবেন, সাথে সাথে আলাদা করতে হবে। একটার জন্য পুরো খামার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

মুরগিকে ডিমে আনতে সাধারণত চার থেকে সাড়ে চার মাস সময় লাগে। লেয়ার মুরগির ক্ষেত্রে মিনিমাম পাঁচ মাস লাগে। ধরেন, আপনি ৫০০০ মুরগি দিয়ে শুরু করলেন—শেষে হয়তো ৪০০০ থাকবে। এই সময় যদি আবার রোগ বা ভুলের কারণে আরও ২০০০ মুরগি মারা যায়, তাহলে যে লসটা হবে, সেটা অসহনীয় এবং অপূরণীয়।

এই ব্যবসায় সবাই কমবেশি লস করে। কখনো ডিম-মাংসের দাম কম থাকে, আবার পরের বছরে বাড়ে। এইভাবেই লাভ-লস সামলে পোলট্রি ব্যবসা চলে।

নতুন যারা ছোট খামার করতে চান, তাদের জন্য আমার পরামর্শ—না জেনে বড় করে শুরু করবেন না। শখের বসে অনেকে অনেক মুরগি দিয়ে শুরু করে ফেলে, যেটা ভুল। অল্প দিয়ে শুরু করতে হবে। ইউটিউব থেকে শিখুন, অভিজ্ঞ খামারির কাছে যান, ভেটেরিনারি হাসপাতাল বা সরকারি ট্রেনিং নিন।

এই প্রজেক্টের মূল কথা হলো নতুন জিনিস ট্রাই করা আর বাজার বোঝা। গাইবান্ধার বাজার তুলনামূলক ছোট, তাই নতুন কিছু করতে গেলে একটু কষ্ট হয়। তারপরও যারা বড় আকারে করে, তারা ঢাকায় সাপ্লাই দেয়।

অল্প জায়গায় ডিমের জন্য করলে ফাওমি, লেয়ার বা লাল লেয়ার ভালো। মাংসের জন্য হলে বয়লার, সোনালী বা কালার বার্ড করা যায়। এখন কালার বার্ড ৪৫ দিনেই বিক্রির উপযোগী হয়, যেখানে সোনালীর ৭০ দিন লাগে।

এখন পর্যন্ত আমি এক থেকে দেড় হাজারের বেশি বাচ্চা বিক্রি করেছি। এডাল্ট মুরগি ও ডিম নিয়মিত বিক্রি হয়। ডিম প্রতি ১১–১২ টাকা করে বিক্রি করি।

এখানে মেইনলি ফাওমি আর দেশি মুরগি আছে। এগুলো দিয়ে আমরা মেশিনে বাচ্চা ফুটাই এবং জাত উন্নয়নের চেষ্টা করছি। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু ফাইটার মুরগিও আছে। বীজ ডিম, খাবার ডিম, এক মাস বয়সী মুরগি, ব্রুডিং কমপ্লিট মুরগি, জিরো বাচ্চা, কোয়েল ডিম—সবই পাওয়া যায়।

যোগাযোগ নম্বর: ০১৬৭৬২৫৯৪৫১