মোটরবাইকের বিউটি পার্লার!

আমার দোকানের নাম নজিপুর পেইন্টিং অ্যান্ড মোটরসাইকেল বিউটি পার্লার। এখানে মূলত মোটরসাইকেলের মডিফিকেশন করা হয়, কালার করা হয় এবং ক্লিনিং করা হয়—মানে একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়া হয়। যেমন কাপড় পরিষ্কার রাখতে যত্ন আর পরিশ্রম দরকার, ঠিক তেমনভাবেই আমরা গাড়ির যত্ন করি।

আমার দোকানে যদি একটা গাড়ি ঢোকে, তাহলে সেটা একেবারে ঝকঝকে হয়ে বের হয়। গাড়ি তো ব্যবহারের জিনিস, পোশাকের মতোই ব্যবহার হয়। তাই পোশাকের মতোই গাড়ির যত্ন নেওয়া দরকার। ধরেন, এই যে একটা গাড়ি আগে ভাঙা ছিল, কালার নষ্ট ছিল—এখন দেখলে মনে হবে একেবারে নতুন। কারণ নতুন করে কালার করা হয়েছে।

গাড়িটা যদি সুন্দর করে সাজানো হয়, তাহলে সেটাকে নতুন গাড়ির মতোই লাগে। এই জন্যই আমার লক্ষ্য হচ্ছে—গাড়িটা দেখলে যেন কারো খারাপ না লাগে। শুধু আমার না, সবারই যেন ভালো লাগে। গাড়িটা ক্লিয়ার করলে দেখতে একেবারে নতুনের মতো ঝকঝকে হয়। আমরা সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় বিশ্বাস করি। তাই এই জায়গার নাম রাখা হয়েছে “বিউটি পার্লার”।

মোটরসাইকেলের যে কালার আমরা ব্যবহার করি, সেটা আমাদের দেশের না। সব বাইরের দেশের কালার—বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের ক্যাঙ্গারু কালার ব্যবহার করি। কোয়ালিটি খুব ভালো। ধরেন, প্রথমে জিনিসটা ভাঙা ছিল। আমরা আগে তাতাল দিয়ে প্লাস্টিক জোড়া লাগাই। তারপর পুটিং করি, ঘষি, আতর মারি, আবার চেক পুটিং করি—যাতে কোথাও কাজ বোঝা না যায়। এরপর কালার করা হয়, শেষে ফিনিশিং আর ক্লিয়ার দেওয়া হয়।

এই পুরো প্রসেস শেষ হলে দেখলে মনে হবে একেবারে অরিজিনাল। আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না যে এটা আগে ভাঙা ছিল। কালারের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন কালো কালার কখনো জ্বলে না, নষ্ট হয় না। লাল কালার একটু জ্বলে, তারপরও পাঁচ-সাত বছর ভালো থাকে।

একবার আমার দোকানে একজন কাস্টমার এসেছিল কালার করার জন্য। কাজ শেষ করে ডেলিভারির দিন আমি ওনাকে গাড়িটা এনে দিলাম। উনি বললেন, “ভাই, এটা তো আমার গাড়ি না।” আমি বললাম, “এইটাই আপনার গাড়ি।” কারণ কাজটা এত ভালো হয়েছিল যে গাড়িটা একেবারে নতুন হয়ে গিয়েছিল।

পুরোনো বাইক দেখতে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু অল্প খরচে যদি সেটাকে সুন্দর করা যায়, তাহলে দেখতে অনেক ভালো লাগে এবং ব্যবহার করতেও মন চায়। এই জন্যই মানুষ আমার কাছে আসে। কালার করলে পুরোনো বাইক আবার নতুনের মতো দেখায়।

আমার এখানে শুধু গাইবান্ধা থেকেই না, আশেপাশের সাতটা থানার এমন কোনো মেকার নাই যে আমাকে চেনে না। রংপুর থেকেও মানুষ আসে কাজ করাতে। গাইবান্ধা জেলায় এই ধরনের দোকান একমাত্র আমারটাই। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি এখানে কাজ করছি।

আমি যখন ডিগ্রি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি, তখন আমার কোনো কাজ ছিল না। আমার বড় ভাই বলেছিল, এমন একটা কাজ আছে যেটা এই এলাকায় নাই, এমনকি জেলাতেও নাই। যদি এই কাজটা শিখি, তাহলে ভবিষ্যৎ ভালো হবে। এরপর আমি আমার বস আলোর দোকানে প্রায় চার বছর কাজ শিখেছি।

শেখার পর মাথায় আইডিয়া আসে—এই কাজটা যদি গাইবান্ধায় শুরু করা যায়। তখন গাইবান্ধা জেলায় এসে কয়েকটা গ্যারেজে কথা বলি। সবাই বলে, “এমন কাজ এখানে চলবে।” তখন থেকেই আমি এখানে ব্যবসা শুরু করি।

শুরুর দিকে মানুষ বিশ্বাস করত না যে মোটরসাইকেলের কালার হয়। কিন্তু এখন সবাই জানে। আমার আরও বড় চিন্তাভাবনা আছে—ভবিষ্যতে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা আছে।

একটা ফুল বাইক করতে ন্যূনতম ছয় দিন সময় লাগে। একটা ট্যাংকের দামই ১৪–১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়, সেটাও লোকাল। আর আমাদের কাজ তো অরিজিনাল কোয়ালিটির। অল্প খরচে যদি পুরো বাইকটা ক্লিয়ার করা যায়, তাহলে গ্রাহকেরও সাধ্যের মধ্যে থাকে।

শুরুর দিকে আমার পুঁজি ছিল প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এখান থেকে যে ইনকাম হয়, সেটা দিয়ে আমি আরেকটা দোকানও রানিং রেখেছি এবং সেখানে ইনভেস্ট করি। যারা এখানে কাজ শিখতে আসে, তাদেরও সুযোগ দিই।

আমি গাইবান্ধা সদর, শাপলা এলাকায় অবস্থান করছি।
আমার নাম মোহাম্মদ মেহেদী হাসান
যোগাযোগ নম্বর: ০১৭১৩৭৩৬৩৬৬